13.7 C
New York
সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১

চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীর ঈর্ষণীয় সাফল্য!

অনলাইন ডেস্কঃ

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ পুলিশে নারীর পদযাত্রা ১৯৭৪ সালে। সে বছরই প্রথমবারের মতো ১৪ নারীকে কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেয় পুলিশ। সীমিত পরিসরের সেই পথচলা পরে প্রেরণা যুগিয়েছে হাজার হাজার উত্তরসূরীকে। পুলিশের সব ইউনিটে এখন কাজ করছেন ১৫ হাজারেরও বেশি নারী সদস্য। চ্যালেঞ্জ নিয়ে সমানতালে তারা এগিয়ে যাচ্ছেন পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে। থানা থেকে ট্রাফিক, কন্ট্রোল রুম থেকে মাঠের অভিযান সবখানেই এখন নারী পুলিশ সদস্যদের সরব উপস্থিতি। তবে ১৯৭৪ সালে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রায় দুই বছর পর্যন্ত পুলিশের নারী সদস্যদের জন্য কোনো নির্ধারিত ইউনিফর্ম ছিল না। ১৯৭৬ সালে বাহিনীটি তাদের নারী সদস্যদের জন্য ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ সদরদফতর সূত্রে জানা গেছে, আইন-শৃঙ্খলায় নিয়োজিত এ বাহিনীতে ক্রমেই বাড়ছে নারীদের অংশগ্রহণ। যোগ্যতা ও সুযোগ অনুযায়ী বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পাচ্ছেন তারা। শুধু তা-ই নয়, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও উজ্জ্বল ভূমিকা রাখছেন বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা।
চ্যালেঞ্জিং এ পেশায় পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে তারা সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছেন। পাচ্ছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। মিলছে স্বীকৃতিও। আর কর্মপরিবেশ বিবেচনায় পুলিশ বাহিনীকে ‘নারীবান্ধব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ।

পুলিশের অনলাইন সেবায় নারী
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সেবাদানের মনোভাবে পুরুষের তুলনায় নারীরা কিছুটা হলেও এগিয়ে। বিষয়টি মাথায় রেখেই জাতীয় জরুরি সহায়তা নম্বর ‘৯৯৯’-এর কল সেন্টারে রাখা হয়েছে ৮০ ভাগ নারী কর্মী। মুজিববর্ষ উপলক্ষে সারাদেশের থানাগুলোতে নারী ও শিশু ডেস্ক চালু করা হয়েছে। এগুলো পরিচালনা করছেন পুলিশের প্রায় চার হাজার নারী সদস্য। তবে এই সেবাখাতে আরও জনবল প্রয়োজন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

সারাবিশ্বে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়া সাইবার অপরাধ ঘটছে বাংলাদেশেও। বিশ্বব্যাপী সাইবার অপরাধীদের অন্যতম প্রধান টার্গেট নারী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তারা হয়রানির শিকার। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইনে নারীদের নিরাপদ রাখতে দেশের প্রচলিত আইন প্রয়োগে সচেষ্ট এই বাহিনী।

অনলাইনে সংঘটিত নারীর প্রতি হয়রানিমূলক অপরাধের অভিযোগ গ্রহণ, প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও আইনি সহায়তা দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ। এ লক্ষ্যে গত বছরের ১৬ নভেম্বর ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ফেইসবুক পেজ খোলা হয়। এ ইউনিটে শুধু নারী পুলিশ কর্মকর্তারা নিয়োজিত রয়েছেন, যেন সাইবার অপরাধের শিকার নারী নিঃসঙ্কোচে তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন।
জাতীয় জরুরি সেবা-৯৯৯ এর সঙ্গে এই পেজের সংযোগ স্থাপন করা রয়েছে। উদ্দেশ্য ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো অথবা ভুক্তভোগী নারীকে সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে আসা। শিশুরা যেন এ ধরনের হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্যও পুলিশ কাজ করে।
এই ইউনিটে অভিযোগ জানাতে হলে ভুক্তভোগী দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে [email protected] ঠিকানায় ইমেইল করে বা ০১৩২০০০০৮৮৮ হটলাইন নম্বরে অথবা ৯৯৯-এ ফোন করে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
‘Police Cyber Support for Women PCSW www.facebook.com/PCSW.PHQ’ নামে ফেসবুক পেজে মেসেজ দিয়েও অভিযোগ জানানো যাবে।
সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নয়টি ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার পরিচালনা করছেন পুলিশের নারী সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন

গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নারী
২০১৮ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো পুলিশের এলিট ফোর্স র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) একটি বিভাগে দায়িত্ব পান এক নারী কর্মকর্তা। র‍্যাব-৮ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত ডিআইজি আতিকা ইসলাম। বর্তমানে দেশের পাঁচটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এবং দুটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নারী। এসপি হিসেবে কুড়িগ্রামে সৈয়দা জান্নাত আরা, লালমনিরহাটে আবিদা সুলতানা, গোপালগঞ্জে আয়েশা সিদ্দিকা, বান্দরবানে জেরিন আক্তার এবং ঝালকাঠিতে ফাতিহা ইয়াসমিন দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে ২০১০ সাল থেকে সাফল্যের সঙ্গে কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন পরিচালনা করছেন বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা।

চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত হিসাবের বরাত দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত মোট নারীর সংখ্যা ১৫ হাজার ১৬৩, যা বাংলাদেশ পুলিশের মোট জনবলের ৭ দশমিক ৯২ শতাংশ।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশের নারী পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে ডিআইজি দুই জন, অতিরিক্ত ডিআইজি তিন জন, পুলিশ সুপার ৭১ জন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ১১০ জন এবং সহকারী পুলিশ সুপার ৯৯ জন। এছাড়া পরিদর্শক ১০৯ জন, উপ-পরিদর্শক (এসআই, নিরস্ত্র) ৭৯৭ জন, সার্জেন্ট ৫৮ জন, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) এক হাজার ১০৯ জন, নায়েক ২১১ জন এবং কনস্টেবল ১২ হাজার ৫৯৪ জন।

বিসিএস (পুলিশ)-এ নারী
১৯৮৬ সালে প্রথম সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে ফাতেমা বেগমের যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে উচ্চপর্যায়ে (বিসিএস) নারীদের নিয়োগ শুরু হয়। এরপর আবার দীর্ঘদিন তা বন্ধ ছিল।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাহিনীটির উচ্চপর্যায়ে নারীদের নিয়োগ পুনরায় চালু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ক্যাডার সার্ভিসে নারীর অংশগ্রহণ আরও বেড়েছে। ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএসে আটজন নারী সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে পুলিশ ক্যাডারে নারীদের প্রবেশাধিকার আবার উন্মুক্ত হয়। ধীরে ধীরে সংখ্যার সঙ্গে বাড়তে থাকে নারী পুলিশের সুনাম ও সাফল্য।

দক্ষ হাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ
পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে নারী সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও আগে ট্রাফিক সার্জেন্ট পদে নারী সদস্যদের দেখা যায়নি। ২০১৭ সালে ২৮ জন নারী সার্জেন্টের যোগদানের মধ্য দিয়ে রাজপথে কাজ করতে শুরু করেন নারী পুলিশ সদস্যরা। বর্তমানে ট্রাফিক বিভাগে সার্জেন্ট হিসেবে কাজ করছেন ৫৮ নারী পুলিশ সদস্য।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নারী
নারী পুলিশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০০৮ সালে চালু করা হয় ‘উইমেন পুলিশ নেটওয়ার্ক’। ২০১২ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় নারী পুলিশের আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়।
১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরাও। চলতি বছরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৫৬ নারী পুলিশ সদস্য জাতিসংঘ মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন।
পুলিশে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে বাহিনীটির সদরদফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) মো. সোহেল রানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমান পুলিশের সব ইউনিটে কাজ করছেন ১৫ হাজারের বেশি নারী পুলিশ সদস্য। চ্যালেঞ্জ নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছেন পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে সমানতালে। যোগ্যতা ও সুযোগ অনুযায়ী বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তারা। শুধু তা-ই নয়, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও উজ্জ্বল ভূমিকায় নারী পুলিশ সদস্যরা। পুরুষ সদস্যদের মতোই তারা সমানতালে, সমান চ্যালেঞ্জে এগিয়ে যাচ্ছেন। চ্যালেঞ্জিং পেশা পুলিশে নারীরা অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। মিলেছে স্বীকৃতিও।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো নির্যাতিত নারী ও শিশুদের একান্ত নির্ভরতা-আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ড. বেনজীর আহমেদ সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে নারী ও শিশুবান্ধব পুলিশিংয়ে জোর দেন। নারী পুলিশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আইজিপির উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের পথে।’

আরও পড়ুন: সাংবাদিকদের ওপর হামলা-মামলা-নির্যাতনের অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে: বিএমএসএফ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ সংবাদ

বিজ্ঞাপন
x