13.7 C
New York
Saturday, July 31, 2021

ভ্রমণ ডায়েরি- ১০ রোমান সম্রাটের দেশ- রোমের পথে পথে

বিজ্ঞাপন

পবিত্র কোরআনে ইতালির রোম নগরীর নামকরনে “আর-রূম” নামে একটি সুরা আছে। রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস এর বিশেষ দূত এর সাথে মদিনার শাসক আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর (রাঃ) এর একটি ঘটনা কোন একটি বইতে আমি পড়েছিলাম।
প্রাচ্যীয় এই রোমান সম্রাট ৬১০ থেকে ৬৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন । খ্রিষ্টধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের তৎকালীন ইতিহাসেও তার উপস্থিতি ও গুরুত্ব বিদ্যমান।

বিজ্ঞাপন

ছোট বেলায় ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত একটি ট্রানসলেশন শুনতে শুনতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম–“রোম শহর এক দিনে গড়ে উঠেনি”
“Rome wasn’t built in a day”. সুইডেনে আসার পর থেকেই আমার খুব ইচ্ছা জেগেছে এই নগরটি কেমন তা দেখতে।

ইতালির রাজধানী রোমে হাটছি আমি আর আমার বন্ধু দুজন মিলে। সে পিএইচডি করছে আনকোনা ইউনিভার্সিটি তে। আজ সকালে আসছি আমি ইতালির নাপোলি শহর থেকে ট্রেন যোগে। আর সে আসছে তার শহর আনকোনা থেকে। হোটেল আগে থেকেই বুক করা ছিল। হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া, সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটার দূরত্ব। খিদে পেয়েছিল দুজনেরই। আমি বললাম, চলো আগে কিছু খাই তারপর হোটেলে যাব। অনেকগুলো খাবার হোটেল চোখে দেখলাম ।হঠাৎ দেখলাম এক বাঙ্গালী চেহারার লোক দাঁড়িয়ে আছে। বলল ,”ভাইয়া আসেন, আমাদের এখানে খেতে পারবেন”। দেশি ভাই এভাবে ডাকছে দেখে ভালোই লেগেছে। গরম গরম পরোটা, ডাল, গরুর কলিজা দিয়ে সারলাম সকালের ব্রেকফাস্ট। পেমেন্ট করতে যাব, দেখি দেখি টোটাল যা আসছে থেকে দুই ইউরো কম নিয়েছেন । ম্যানেজার ভদ্রলোক বললেন , আমরা সবাই দেশী ভাই তো, সমস্যা নাই। আপনারা আসবেন এখানে।” খুব ভালো লেগেছে বিদেশে দেশী ভাইটির আন্তরিকতায়। এই শহরে আমরা দুজনেই নতুন। সে ইতালিতে থাকে প্রায় বছরখানেক আগে থেকে, কিন্তু রোম সিটি তে আজই প্রথম । হোটেলের ভাইটি আমাদের অনেক গাইডলাইন দিলেন ভ্রমণ সম্পর্কে।
যাহোক আমরা হোটেলে ব্যাগ রেখে ফ্রেস হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম শহর নগর ভ্রমণে। ইতালিয়ানরা তাদের রাজধানী শহর কে Roma নামে ডাকেন। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৩ এ এই শহর প্রতিষ্ঠা। রাজা Romulus এর নামে এই শহরটির নাম করন। ইউনেস্কো কর্তৃক ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে এ শহরের একটা বিশেষ অংশ নির্ধারিত হয়েছে। ইউরোপের যতগুলি দেশে আমি ভ্রমণ করেছি, তারমধ্যে ইতালিকে আমার কাছে একটু ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। এখানে সব কিছুই আছে পাহাড়-সমুদ্র, বিশ্ব ঐতিহ্য, ইতিহাস বিজড়িত অনেকগুলো জায়গা। খ্রিস্টপূর্ব এবং খ্রিস্টাব্দ এর সময়ে ঘটনাবহুল অনেক ঘটনার সাক্ষী এই ইতালি। এখানে যেমন আছে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি Colosseum সহ
ভিসুভিয়াস-আগ্নেয়গিরি, সাথে পম্পেই নগরী, সহ অনেক বিশ্ব ঐতিহ্য, আবার অন্যদিকে আছে ভেনিস নগরী যে নগরীর প্রধান বাহন নৌকা , স্পিডবোট, প্রমোদ তরী। মোটামুটি এই কারণেই ইতালি দেশটি আমার কাছে বেশি নজর কেড়েছে। ইতালিতে হাজারো বিদেশীর বসবাস। আফ্রিকান মানুষের আনাগোনা একটু বেশি মনে হল যেভাবে আমি ফ্রান্সের প্যারিস নগরীতে দেখেছিলাম।
ইতালিতে এসে গত কয়েক দিনের মধ্যে আমি কয়েকটি শব্দ /বাক্য শিখেছি। এবং এগুলো প্রয়োগ করে ফলও পাচ্ছি ভালোই।
Grazie উচ্চারণটা হবে গ্রাদ সিএ মানে থ্যাংক ইউ সো মাচ।
Mi scusi মানে হলো এসকিউজমি /সরি
Bravo ragazzo মানে হল গুডবাই (তোমার সাথে আবার দেখা হবে)
ইতালির পুলিশ-আমার কাছে মনে হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে মানবিক পুলিশ। একবার আমি আর আমার ভাই Napoli শহরের প্রধান স্টেশন- Piazza Garibaldi থেকে বাসে উঠে কোথাও জানি যাচ্ছিলাম, এখানে বাস সার্ভিসের সিস্টেম টা অন্যরকম। কার্ড পাঞ্চ করেও পারবেন অথবা ক্যাশ টাকা, কয়েন দিয়েও যেতে পারবেন। বাসে উঠার পর দেখলাম সবাই পাঞ্চ করছে দু’একজন ক্যাশ/ কয়েন দিচ্ছে মেশিনে । একজন আফ্রিকান কে দেখলাম কিছুই করলো না। আমি ভাইয়াকে বললাম, উনি’ত কার্ড পাঞ্চ করল না, টাকাও দিল না তাহলে উনার কি হবে ? তিনি আমাকে যেটা বললেন সেটার সারমর্ম হচ্ছে এরকম, ইতালির বাস অথবা পুলিশ কর্তৃপক্ষ মনে করে যে,উনার যদি টাকা বা কয়েন থাকতো তিনি অবশ্যই বাস ভাড়া পরিশোধ করতেন ,হয়তো ওনার কোনটাই নেই তাই তিনি পরিশোধ করেন নাই। বিষয়টা আমাকে খুবই ভাবিয়ে তুললো। তিনি আমাকে আরও বললেন এটা পোপের দেশ। এদেশে কেউ আসলে তাকে বিতারিত করা যাবে না। ইউরোপের কিছু কিছু দেশ আছে অতিমানবিক। এখানে ধর্মের চেয়ে মানবতাবোধ অনেক অনেক উপরে। তার মধ্যে ইতালি অন্যতম, ওরা জাতিগতভাবে খুবই মানবিক। এজন্যই তো বেশ কয়েক বছর আগে দলে দলে বিভিন্ন দেশ থেকে আফ্রিকা থেকে নৌকা স্পিডবোট যোগে একটি উন্নত জীবনের আশায় এদেশে প্রবেশ করত।
যাহোক, রোমের রাস্তায় কিছু মানুষকে দেখলাম বিভিন্ন খেলনা, ফুল বিক্রি করছে, অনেকে আবার নিজের ক্রিয়েটিভিটি -চিত্র অংকন এর মাধ্যমে দেখাচ্ছে। Colosseum এর আসে পাশে কিছু কিছু লোকের ক্রিয়েটিভিটি লেভেল দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারবেন না। তারা মানুষের কাছে হাত পাতবে না, তাদের শৈল্পিক কার্যকলাপ দেখিয়ে কাজ করে খাবে অথচ আমাদের দেশে শুধু ভবঘুরে নয় অনেক সুস্থ ,সবল মস্তিষ্কের মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি করে তাদের জীবন নির্বাহ করছে।
ইউরোপের প্রায় সবগুলো পর্যটন নগরীতে,পর্যটকদের সুবিধার্থে কতগুলো বিশেষ বাস চলাচল করে বিভিন্ন প্যাকেজ এ। প্যাকেজের আওতায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ১০ থেকে ১২ টি স্থানে আপনার যেখানে খুশি সেখানে নামবেন আবার যেখানে খুশি সেখানে থেকে উঠবেন।
কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম অনেক বাংলাদেশি ভাই দাঁড়িয়ে আছে একসাথে বিভিন্ন রঙের টি-শার্ট এবং ক্যাপ মাথায় দিয়ে। ওরা আসলে এখানে পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত। ওর মধ্যে কেউ কেউ টুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করেন এবং টুরিস্ট বাসের টিকেট টিকেট বিক্রি করেন। এদের মধ্যে একজন ভাইকে দেখলাম আমাদের কাছে এগিয়ে আসতে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন তার নাম মহিউদ্দিন, বাড়ি চট্টগ্রামের মেহেদীবাগে। আমাদের সাথে পরিচিত হতে পেরে উনি খুব খুশি হলেন তা তাঁর চোখে-মুখে বুঝা যাচ্ছে। আমাকে বললেন, ভাই – আমাদের তিন কালারের বাস সার্ভিস আছে , তিনটি ভিন্ন ভিন্ন রুটে চলবে, তিনটি ভিন্ন প্যাকেজ, দামও আলাদা আলাদা। আমাদের কাছ থেকে তিনি সব চেয়ে ভালো প্যাকেজটি দিলেন, যেটা পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র দেশ- ভ্যাটিকান সিটিতেও নিয়ে যাবে। ০৬ ইউরো দাম কম রাখলেন। আসলে দেশি ভাই-বোন পেলে ওরা অন্যদের চেয়ে দাম কম রাখতে পেরে নিজেরা অন্যরকম আত্মতৃপ্তি ও আনন্দ পায়।
আমরা ঝটপট বাসে উঠে পড়লাম। দেখতে থাকলাম পৃথিবীর অন্যতম পুরাতন ঐতিহ্যবাহী নগরী। নানান দেশের, নানান ধরনের মানুষ রোমের পথে পথে হাঁটছে। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। আমরাও মাঝে মাঝে বাস থেকে নেমে পড়েছি আর হেঁটে হেঁটে দেখছি রোম নগরীর প্রাচীন স্থাপনা….. সে এক অদ্ভুত ভালো লাগা। মনে হচ্ছে আমরা সেই প্রাচীন যুগে ফিরে গিয়েছি…
(চলবে) Azizul Moula facebook টাইমলাইন থেকে নেওয়া । লেখক মোহাম্মদ আজিজুল মওলা

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

Please enter your comment!
Please enter your name here

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ সংবাদ

x