13.7 C
New York
মঙ্গলবার, মার্চ ২, ২০২১

ভ্রমণ ডায়েরি

মোহাম্মদ আজিজুল মওলা

বিজ্ঞাপন

এইতো সপ্তাহখানেক আগে বসনিয়ার জঙ্গলে শত শত বাংলাদেশী যুবক ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ক্রোয়েশিয়া প্রবেশের চেষ্টায় সেদেশের জঙ্গলে আটকা পড়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়ার খবর আমরা জার্মানভিত্তিক নিউজ চ্যানেল ডয়চে ভেলে-র মাধ্যমে জেনেছি। অবৈধভাবে কোন একটি দেশের সীমানায় প্রবেশ করাকে তারা বলছেন “গেম মারা” । নিউজটি দেখার পর সেই বিষয়ে আপনাদের জানানোর উদ্দেশ্যে কিছু লেখার আগ্রহ জাগল।

বিজ্ঞাপন

কিসের আশায় তারা এদেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল তার দিকে একটু নজর দেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে উন্নত জীবন যাপনের আশায় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্তের অনেক যুবক এদেশগুলোতে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখে।

এই দেশ গুলোতে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এসে এখানকার অভিবাসী হয়েছেন । সুইডেনে দেখলাম, বিভিন্ন দেশের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যুবক-যুবতীরা ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে এদেশে আসে। পড়াশোনা শেষ করে ওয়ার্কপারমিট নিয়ে এদেশে কিছুদিন কাজ করে। অনেকে আবার পড়াশোনার একটি কোর্স শেষ হলে আরেকটি কোর্সে ভর্তি হয় । এভাবে তাদের সুইডেনে অবস্থানকালে র সময়কে বৃদ্ধি করে। রেসিডেন্ট পারমিটের জন্য এপ্লাই করে। পরবর্তী কালে রেসিডেন্ট কার্ড পেয়ে গেলে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করে। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, উন্নত ও নিরাপদ জীবন, সর্বোপরি সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে করে এদেশে মানুষ আসলে থেকে যাওয়ার চিন্তা তাদের মাথায় ভর করে। আমার সাথে পরিচিত অনেকেই এদেশে থেকে গিয়েছে। এখানে এসে যারা settled হয়েছেন তাদের সবাই আমি বলবো তাদের আতবিশ্বাস, পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়ের ফসল। ডা: লুৎফর রহমানের “উন্নত জীবন” নামে একটি বইয়ে পড়েছিলাম “যে কাজই করো না কেন , তাতে যদি তোমার মন ঢেলে দিতে পারো, তাহলে আর কোন ভয় নেই। বিশ্বাস এবং সুনির্দিষ্ট ইচ্ছার সম্মুখে অসম্ভব সম্ভব হয়ে যায়”।

বিজ্ঞাপন



সুইডেন দেশটির অদ্ভুত কিছু রীতিনীতি আমাকে অবাক করেছে। আমাদের দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে অন্যতম প্রধান সমস্যা বলে মনে করা হতো এক দশক আগেও। এখন একটু অন্যভাবে বলা হচ্ছে। আর এই দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ০.৬৩% । জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারটা আসলে অভিবাসীদের কারণে ধনাত্মক, তাদেরকে বাদ দিয়ে হিসাব করলে ঋণাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর বছর এখানে জনসংখ্যা বাড়ে না বরং কমে। এইজন্য ওরা পৃথিবীর কম সুবিধাসম্পন্ন অথবা যে-সমস্ত দেশ যুদ্ধ-বিগ্রহে জর্জরিত সে-সমস্ত দেশ থেকে মানুষদের আসার জন্য আহবান করে।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপে জার্মানির পরেই সুইডেনে খুব সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অভিবাসী লোক বসবাস করে । ইউরোপের এই দেশগুলোতে ধর্মের চেয়ে মানবিকতায় অনেক বড়। সুইডেনে কেউ নাগরিকত্ব পেয়ে গেলে তাকে সুইডিশ ধরে নেওয়া হয় কোন পৃথক করা হয়না। সুইডিশরা যে সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্র থেকে ভোগ করে তারাও সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন। যে কোন দেশ থেকে আগত এদেশে নাগরিকত্ব পাওয়া এখানে যে কোন পিতা মাতা সন্তান জন্ম দিলে তাদেরকে বড় অংকের ভাতা দেওয়া হয় এবং আরো সন্তান জন্মদানের জন্য উৎসাহিত করা হয়। এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়-এ দেশের লোক সংখ্যা বছর বছর কমছে তাই তাদের জনসংখ্যা কে ধরে রাখার জন্য অভিবাসীদের কে আহবান করেন অথবা এদেশের যেগুলো কায়িক শ্রমের কাজ সেগুলো করার জন্য এরা তাদেরকে কাজে লাগায়।

সুইডেনের সুপার শপ, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, যাতায়াতের জন্য পাবলিক বাসের ড্রাইভার , অন্যান্য ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য দেশ থেকে এদেশে আগত অভিবাসীরা চালায়। খুব কম সংখ্যক সুইডিশ কে দেখলাম গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে পাবলিক বাস চালাতে। আরব এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূত সুইডিশ রা এ কাজগুলো করে।



ইউরোপে ৩ ক্যাটাগরির দেশ রয়েছে। সেনজেনভুক্ত দেশ গুলোতে একটি মাত্র ভিসা নিয়ে ২২ টি দেশে প্রবেশ করতে পারবেন। আবার কয়েকটি দেশ আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত কিন্তু সেনজেন ভুক্ত নয় যেমন, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া, সাইপ্রাস । আবার দেখা যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত নয় কিন্তু সেনজেনভুক্ত, যেমন আইসল্যান্ড,নরওয়ে, লিচেনস্টেইন, সুইজারল্যান্ড। যাহোক, অভিবাসীদের প্রথম পছন্দের তালিকায়-সেনজেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। যাতে করে একটি দেশে প্রবেশ করলে সেদেশে সুযোগ সুবিধা করতে না পারলে অন্য কোন দেশে সহজে পাড়ি দিতে পারেন। অনেকে কোন একটি দেশে বৈধভাবে হোক আর অবৈধভাবে হোক প্রবেশ করার পর,কাজের সন্ধানে অন্য দেশে চলে যায় এবং সেদেশের ওয়ার্ক পারমিট নেওয়ার চেষ্টা করে।
এই তো বললাম ছাত্র ছাত্রী হিসেবে ইউরোপে প্রবেশ করার স্বপ্ন। আরো অনেক ভাবে ইউরোপে প্রবেশ করা যায়। অনেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য এপ্লাই করে এটাকে বলে এসাইলাম ভিসা। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে সে তার জন্মভূমি নিজ দেশে নিরাপদ নয় ,সেদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান ,গোত্রে গোত্রে দ্বন্দ্ব, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, তার নিজের অথবা তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাস করা তার জন্য নিরাপদ নয়, বিভিন্ন গ্রাউন্ড তৈরি করে সে ইউরোপের দেশগুলোতে অ্যাপ্লিকেশন করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে জার্মানি, তারপরে আছে ফ্রান্স,স্পেন, ইতালি, ডেনমার্ক ও সুইডেন। আর একটা সিস্টেম আছে অভিবাসী হবার সেটা হচ্ছে ইনভেস্টমেন্ট এর মাধ্যমে। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ইনভেস্ট করার মাধ্যমে সে দেশে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রাথমিক ধাপ পূরণ করতে পারবেন।



ইউরোপের দেশগুলোতে সচরাচর গণতন্ত্র চলে। অনেক সময় উন্নত দেশগুলোতে গণতন্ত্র বিষের কাঁটা হয়ে যায়, তাদের অভিবাসন নীতির সাথে অসামঞ্জস্যের কারণে। একদিন শুক্রবার বিকালে, মালমো শহরের রোজেন গার্ড নামে এক এলাকায় গিয়েছিলাম, গৃহস্থালির বিভিন্ন টুকিটাকি বাজার এবং সাপ্তাহিক বাজার করার উদ্দেশ্য নিয়ে। সিটি বাস থেকে নামার পর কিছু লোকজনকে ছোটাছুটি করতে দেখলাম। তাদের দেখাদেখি আমিও ঝটপট একটি সুপার শপে ঢুকে পড়লাম। কেনাকাটা শেষ করে, ডানে বামে তাকিয়ে, পরিস্থ তাকিয়ে, পরিস্থিতি বুঝে হাঁটা ধরলাম বাস স্টপেজের কাছে। চিন্তা করতেছি এই ধরনের ঘটনা তো কখনও কোন সময় ঘটেনি, বিষয়টি নিয়ে জানার চেষ্টা করলাম পাবলিক বাসে উঠে পাশের সিটে বসা যাত্রীর কাছ থেকে। তিনি আমাকে যা বললেন তার সারমর্ম হল এই, রোজেন গার্ড এলাকাটি আরব অধ্যুষিত আরব বংশোদ্ভূত সুইডিশদের এলাকা। এই এলাকাটিতে মাঝে মাঝে দু একটি ভিন্ন গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়ে থাকে । এলাকায় পুলিশ মাঝে মাঝে এসে টহল দিয়ে যায়। এই এলাকা নিয়ে শহরের মেয়রও মনে হয় খুব বেশি চিন্তিত। এইখানে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের চর্চা হয়। সুইডেনে আরব বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের সংখ্যা এত বেশি যে ওরা ভোট দিয়ে চাইলে কোন একটি আইন চেন্জ করে ফেলতে পারে আবার হয়তোবা শরিয়া আইন জারির জন্য প্রস্তাবও ক’রে ব’সে থাকতে পারে। এজন্য সুইডেনের সরকার ওদেরকে খুব টেকনিক্যালি হ্যান্ডেল করে। বিষয়টি আমাকে খুব বেশি ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল। আসলে ঘটনা সত্যি। গণতন্ত্র সবসময় ভালো কিছু বয়ে আনবে বিষয়টি সে রকম নয় ।
(চলবে)

ভ্রমণ ডায়েরি -১৪ ইউরোপে অভিবাসনের স্বপ্ন
লেখক মোহাম্মদ আজিজুল মওলা
উপ-সচিব-চট্টগ্রাম বন্দর কতৃপক্ষ।

আরো পড়ুন:ঝিনাইগাতীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলণকারীদের দাপটে বৈধ ইজারাদার হতাশ

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ সংবাদ

x