মেয়াদোত্তীর্ণ কালুরঘাট সেতু এখনো ভরসা

নতুন আনা ইঞ্জিন পুরাতন সেতু দিয়ে চলতে পারবে না

0
4
মেয়াদোত্তীর্ণ কালুরঘাট সেতু এখনো ভরসা

জাহাঙ্গীর আলম
এক শ বছরের পুরোনো চট্টগ্রামের কালুরঘাট সেতুকে ২০ বছর আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা দিয়েছিল খোদ রেলওয়ে। ওই ঘোষণায় বলা ছিল, ১২ টন ওজনের ভারবহন ক্ষমতার (লোড এক্সেল) বেশি ট্রেন এই সেতুতে কোনোভাবেই চালানো যাবে না। বার বার পাটাতনের কাঠ পাল্টানোয় ঝুঁকি বৃদ্ধি, বয়সের কারণে বড় পিলার, স্প্যান নড়বড়ে হয়ে পড়াসহ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণে ২০০১ সালেই এই ঘোষণা দেয় রেলওয়ে।

কিন্তু সেই জরাজীর্ণ রেলসেতু দিয়েই চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের একটি পরামর্শকদল গত মাসে কালুরঘাট রেলসেতু পরিদর্শন করে গেছে। দলটি এই সেতুতে ভারবহন ক্ষমতার তুলনায় ৩-৪ টন বেশি অর্থাৎ ১৫-১৬ টন এক্সেল লোডের ট্রেন চালানোর উপযুক্ততা যাচাই করে গেছেন বলে রেল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি পরামর্শক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. আ খ ম সাইফুল আমিন।

রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন
গত ২৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের নির্মাণাধীন আইকনিক রেলস্টেশন পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি ঘোষণা দেন, আগামী বছরের ডিসেম্বরে অর্থাৎ ১৩ মাস পরই চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ট্রেন চলাচল শুরু হবে। রেল কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রেন চালাতে হলে পুরোনো সেই কালুরঘাট সেতু ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। পুরোনো সেতু বাদ দিয়ে নতুন সেতু বানাতে হলে সময় লাগবে অন্তত ৫-৬ বছর।

এদিকে ইঞ্জিন সংকটের কারণে সাড়ে ৭ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে দোহাজারী রুটের ট্রেন চলাচল। সড়ক পথে অধিক ভাড়া এবং যানজটের কারণে দিন দিন ট্রেনের প্রতি যাত্রীদের আগ্রহ বাড়ছে। সড়ক পথের তুলনায় রেলপথের ভাড়া একেবারেই কম। তাছাড়া নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণের জন্য সাধারণ মানুষ সবার আগে ট্রেনকেই বেছে নেন।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যিক বিভাগ থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-দোহাজারী,রুটের রেললাইন মেরামত করার পর ট্রেনের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। রেলমন্ত্রী নিজে দোহাজারী এবং পটিয়ায় উপস্থিত থেকে এই রুটে আরো দুটি ট্রেন সার্ভিসের উদ্বোধন করেছিলেন। এরপর থেকে যাত্রী সংখ্যাও আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেড়েছে এই দুই রুটে। সেই সাথে রাজস্বও বেড়েছে আগের চেয়ে।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার রতন কুমার চৌধুরী আমার সময়কে জানান, চলতি বছরের ৫ এপ্রিল থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত করোনার কারণে সারাদেশের মতো চট্টগ্রাম-দোহাজারী রুটে সকল ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে ১০ আগস্ট থেকে দোহাজারী রুটে সকল লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এখন দুটি ডেমু ট্রেন চলাচল করে। একটি পটিয়া পর্যন্ত এবং অপরটি দোহাজারী পর্যন্ত। দোহাজারী রুটে আগে দুটি লোকাল ট্রেন চলাচল করতো। বর্তমানে ইঞ্জিন সংকটের কারণে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রুটে লোকাল ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পরিবহন বিভাগ থেকে জানা গেছে। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া থেকে উচ্চ গতির ২০টি ইঞ্জিন ক্রয় করা হয়েছে। গত ২১ নভেম্বর দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আরো ১০টি ইঞ্জিন চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে।

রেলের মেকানিক্যাল বিভাগ বলছে, আগের সবচেয়ে ভারী ইঞ্জিনগুলোর গড় ওজন প্রতি এঙেলে ১১ দশমিক ৯৬ লোডের হিসাবে (প্রতিটি ইঞ্জিনে ৬ এঙেল) ৭০ থেকে ৭২ টন। বর্তমানে আমদানি হওয়া ইঞ্জিনগুলোর গড় ওজন ১০০ টনেরও বেশি (প্রতি এঙেলে ১৫ থেকে ১৬ টন)। সর্বশেষ প্রযুক্তির ইঞ্জিন হওয়ায় এসব ইঞ্জিন এঙেল লোডের হিসাব থেকেও ভারী হয়। সে কারণে আমদানি হওয়া নতুন ইঞ্জিনগুলো প্রায় শতবর্ষী সেতুগুলো দিয়ে পারাপারের সময় দুর্ঘটনা ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। এতে রেলের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি হতাহতের আশঙ্কাও প্রবল বলে মনে করছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।

নতুন আমদানিকৃত এসব অত্যাধুনিক ভারী ইঞ্জিনের ভার বহনে সক্ষম নয় পূর্বাঞ্চল কালুরঘাট সেতুসহ অনেক সেতু। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এসব সেতুতে নতুন ইঞ্জিন চলাচলের বিষয়টি না ভেবে আমদানি করায় বিপাকে পড়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এখন এসব ইঞ্জিন ব্যবহারের জন্য সেতুগুলোতে সংস্কার কাজের পরিকল্পনা রেলওয়ের।

ঊর্ধ্বতন এক রেল কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নতুন। এতে ভারবাহন ক্ষমতা বাড়ানো আছে। তবে কালুরঘাট সেতুর ভারবাহন ক্ষমতা কম। তাই এখন প্রশ্ন উঠছে ২০২২ সালের মধ্যে যদি ট্রেন যায়, তাহলে এই সেতু দিয়ে নতুন ট্রেন কীভাবে যাবে? কারণ নতুন কোচ ও লোকোমোটিভের ভারবাহন ক্ষমতা বেশি। তাই ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল চলাচলে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জোড়াতালি দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলযাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হবে।

কালুরঘাট সেতুর দৈর্ঘ্য ৬৩৮ মিটার, স্প্যান ১৯টি। বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় সেতুটিতে ট্রেন ও যানবাহন চলাচল করছে। এই সেতুর সমান্তরালে ৮০ মিটার উজানে ৭২০ মিটার দীর্ঘ একটি নতুন রেল সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

প্রসঙ্গত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পটিতে আগস্ট পর্যন্ত কাজ শেষ হয় ৬২ শতাংশ। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে এই প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে প্রকল্পের নির্মাণ সময় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।