শিশুর খাদ্যপণ্যে প্লাস্টিক খেলনা , সংকটে শিশু স্বাস্থ্য

মো.নাজমুল হোসেন, বগুড়া প্রতিনিধি

-আম্মু ওটা ( পটেটো চিপস ) নিবো আমি!
– না বাবা, ওটা নিও না।
– না না না ( কান্না ) আমি নিবোই
– আচ্ছা!

বলছিলাম দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া সুমাইয়া ও তার মায়ের কথাপোকথন। মুদি দোকানে প্রয়োজনিয় জিনিস নিতে এসেছেন আছিয়া বেগম, সঙ্গে মেয়ে সুমাইয়াও।

সাড়ে আট বছরের সুমাইয়ার প্রতিদিন রোজকার খাবারের সঙ্গি পটেটো চিপস। বাবাও অফিস শেষে বাসায় ফেরার সময় আনেন এই পটেটো।



সুমাইয়ার কাছে চিপসটা যতটা প্রয়োজন তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্যাকেটের ভেতরে থাকা প্লাস্টিকের খেলনা।

আছিয়া বেগম বলেন, টিভিতে দেখে বাচ্চা কান্নাকাটি করে, তাই না কিনে দিয়েও পারি না।অবুঝ! তার দরকার খেলনা। খেলনা দিয়ে খেলতে খেলতে অনেক সময় মুখেও দেয়। ভয়ে থাকি ভেতরের খেলনা আবার মুখে আটকে যায় কিনা!

সুমাইয়া জানায়, বন্ধুদের ভেতরে কার কতটি এ রকম খেলনা রয়েছে, এ নিয়ে প্রতিদিন তাদের কথা হয়, প্রতিযোগিতা হয়।

শুধু কি সুমাইয়ার মা আছিয়া বেগমই! অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে একই চিত্র দেখা গেছে প্রায় সব খানেই।



একটা মোড়কের ভেতরে খাবারের সঙ্গে প্লাস্টিক মেশানো হচ্ছে, আর এটা ক্ষতিকর হতে বাধ্য। কারণ, প্লাস্টিকের ঘর্ষণে গুঁড়ো পড়তে থাকে, রং মিশতে থাকে, আর এসব খাবারের রং কিসের সেটাও আমরা জানি। এটা চোখ বুজেই বলে দেওয়া যায়, কতটা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছি আমরা শিশুদের। কোনও সন্দেহ নেই যে এগুলো শিশুস্বাস্থ্যের জন্য ভবিষ্যৎ হুমকি হয়ে কাজ করছে।

চিপস, চকোলেট, ওয়েফারসহ নানা রকমের শিশুখাদ্যে এখন বাজার সয়লাব। দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো থাকে এগুলোর আকর্ষণীয় প্যাকেট। আর বিক্রি বাড়াতে এসব শিশুখাদ্যের সঙ্গে থাকছে খেলনা উপহার। টেলিভিশনে ওইসব খাদ্যের সঙ্গে বিভিন্ন রকম খেলনা উপহারের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে শিশুরা অভিভাবকদের কাছে এসব খাদ্যের আবদার করে। বিভিন্ন কোম্পানির শিশুখাদ্যের সঙ্গে উপহার হিসেবে থাকে অতিক্ষুদ্র আকৃতির খেলনা।



অভিভাবকদের অভিযোগ, কম বয়সী শিশুদের খাদ্যে উপহার হিসেবে খেলনা দিলে এতো ক্ষুদ্র হওয়া উচিত নয়। এত ক্ষুদ্র খেলনা যে কোনও সময় মুখে দিলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

জানা গেছে, গত ২৯ ফেব্রুয়ারি চিপসের প্যাকেটের ভেতরে ক্ষুদ্র আকৃতির খেলনার কারণে প্রাণ হারায় ১১ মাস বয়সী ঝালকাঠির শিশু তামিম।

কাপড়ে ব্যবহৃত রং, কৃত্রিম ফ্লেভার, ঘনচিনি ও স্যাকারিনের দ্রবণ মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের জুস এবং জেলিসহ ভেজাল খাদ্যপণ্য। আর এসব পণ্যের প্রধান ভোক্তা হচ্ছে শিশুরা। এতে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না!



রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরের একটি কারখানায় গিয়ে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত দেখতে পান , কাপড়ে ব্যবহৃত রং, কৃত্রিম ফ্লেভার, ঘনচিনি ও স্যাকারিনের দ্রবন মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের জুস এবং জেলি।

‘কাদের ফুড প্রোডাক্টস’ নামে ওই প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবদুল কাদেরকে ভেজাল খাবার তৈরির দায়ে দেড় বছরের কারাদন্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু কারাদণ্ড দেয়ার আগে গত দুই বছর ধরে এ প্রক্রিয়ায় ভেজাল জুস আর জেলি উৎপাদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি ।

জাতিসংঘ রেডিওর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসেব মতে, ভেজাল বা দূষিত খাবার প্রতিবছর প্রায় চার লাখ কুড়ি হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটাচ্ছে যাদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হচ্ছে পাঁচ বছরেরও কম বয়েসী।

কোয়ান্টাম করপোরেশন লিমিটেডের কোকোমো প্রিমিয়াম ফান বিস্কুটস, এটির দাম ১০ টাকা। প্যাকেটের ভেতরে পাওয়া গেল লাল রঙের এক ইঞ্চি আকারের প্ল্যাস্টিকের হরিণ। একই কোম্পানির পার্কি কোকোমো অরেঞ্জ বিস্কুটের প্যাকেটেও রয়েছে ক্ষুদ্র আকৃতির খেলনা বাঘ।আর পটেটো চিপসএ উপহার হিসেবে প্যাকেটের মধ্যে আছে খেলনা।



প্যাকেটজাত শিশুখাদ্য বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করে দেখা গেছে, বেশ কিছু প্যাকেটজাত খাবার পাওয়া গেল যেগুলোর সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে ফ্রি খেলনা।

প্রাণ কোম্পানির উইন পিলো চকোলেট ওয়েফারের সঙ্গেও দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন রকমের ক্ষুদ্র আকৃতির প্রাণী। কোকোবিস চকোলেট ফিল্ড বিস্কুটের প্যাকেটেও দেওয়া হচ্ছে হলুদ রঙের সাপ। এসব প্যাকেটের গায়ে কোন সতর্ক বার্তা নেই।

একই কোম্পানির পার্কি কোকোমো ওরেঞ্জ বিস্কুটের প্যাকেটেও রয়েছে একই কথা লেখা। প্যাকেটগুলোর ওপরে কার্টুন ছবি দিয়ে আরও আকর্ষণীয় করা হয়েছে।

কোকোবিস চকোলেট ফিল্ড বিস্কুটের প্যাকেটের ভেতরে পাওয়া গেল হলুদ রঙের প্লাস্টিক সাপ।

আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও গবেষকেরা বলছেন, ভেজাল খাবার খেয়ে শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। তাদের শরীরে এসব উপাদান ‘স্লো পয়জনিং’-এর মতো কাজ করছে।



এদিকে চলতি বছর ক্ষতিকর প্লাস্টিকের খেলনার উৎপাদন, আমদানি এবং বাজারজাত বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। নোটিশে নিরাপদ প্লাস্টিকের খেলনার জন্য নীতিমালা করতে বলা হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়, প্লাস্টিকের খেলনা মূলত হালকা ও ভারি প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হয়। এসব প্লাস্টিকে অনেক ধরনের ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ থাকে। তা ছাড়া প্লাস্টিকের খেলনাকে আকর্ষণীয় করতে নানারকম ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। কখনও কখনও শিশুরা এসব খেলনা মুখে দেয়। এতে প্লাস্টিকের ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। এতে ক্যান্সারসহ নানারকম দুরারোগ্য রোগের সৃষ্টি করে।

নোটিশে আরো বলা হয়, পৃথিবীর অনেক দেশে নিরাপদ প্লাস্টিকের খেলনার নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো নীতিমালা নেই।



মায়েদের অভিযোগ, শিশুখাদ্যের ভেতরে বেশিরভাগ খেলনা থাকে লাল রংয়ের। শিশুরা লাল রংয়ের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয় বলেই কোম্পানিগুলো এই ব্যবসায়িক কৌশল নিয়ে থাকে।

কুইনস ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনের সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ‘বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা’ তাদের এক প্রতিবেদনে লিখে, বিশ্বব্যাপী শিশু খাদ্য পণ্যে ৭৫ শতাংশ আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

বি এস টি আই এর অনুমোদনহীন মানহীন এসব খাদ্য খেয়ে কঠিন-জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের উদাসিনতার ফলে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা পেয়ে রাতারাতি ‘আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ’ বনে যাচ্ছেন। অন্যদিকে এসব নকল খাদ্য খেয়ে শিশুরা স্বাস্থ্য ঝুকিঁর মধ্যে পড়েছে।

আর এসব শিশু খাদ্য বিশেষ করে শহরের নিন্মবিত্ত এবং গ্রামের সহজ সরল সাধারন মানুষ না বুঝে তার শিশুকে এসব শিশু খাদ্য নামে বিষ হাতে তুলে দিচ্ছে।

এ ধরনের খাদ্য দ্রব্যগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয় , কিন্ডারগার্ডেন স্কুল ,প্রাক-পাইমারী স্কুল সহ শিশুদের শিক্ষা প্রতিষ্টানের আশেপাশে বেকারী , মুদীর দোকান, ভ্যারাইটি স্টোর ও চায়ের দোকনে বেশী পাওয়া যায়।



এধরনের শিশু খাদ্যগুলো নজর কারা রং বেরঙ্গের মোড়ক লাগিয়ে প্যাকেট জাত করলেও তার গায়ে নেই সরকার অনুমদিত বিএস টি এর সিল এমনকি তৈরি কিংবা মেয়াদ উর্ত্তীন তারিখ সম্বলিত কোন সিল মোহর নাই । আবার কোন কোন প্যাকেটের গায়ে বিএসটি আই এর নকল সিল চোখে পড়লেও নেই উৎপাদনের তারিখ কিংবা মেয়াদ উর্ত্তীনের তারিখ ।

অভিভাবক মহল বলছে, শহরে ভেজাল নকল ও মান হীন শিশু খাদ্য প্রতিরোধে জোরালো কোন অভিযান পরিচালনা না করায় এগুলো দিনদিন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

Please enter your comment!
Please enter your name here