13.7 C
New York
শনিবার, মে ৮, ২০২১

স্মৃতিপটে বাবা এডভোকেট মোজাফফর আহমদ চৌধুরী (মোজাফফর মোক্তার)

বিজ্ঞাপন

হাসিনা আকতার কোহিনুরঃ
বাবা মানে উত্তপ্ত সূর্যের প্রখর তাপের নিচে বিশাল বট গাছ। যার শীতল ছায়া সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু পিতৃহীন হয়ে বড়ো হওয়া বিশাল দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। জন্মেছিলাম আমরা তিন বোন সোনার চামচ মুখে নিয়ে। সময়ও কাটছিল আদরে-সোহাগে,স্নেহ-ভালোবাসা আর মায়া-মমতায়। বাবার সাম্রাজ্যে তার রাজকন্যাদের কদরের সীমা ছিল না। বিশেষ করে বড় আপা চেমন আরা বেগম, আমি হাসিনা আকতার কোহিনুর ও নাছিমা আকতার শাহিনুরকে ঘিরেই বাবার আনন্দের ভূবন আবর্তিত হচ্ছিল। আর বাগানের শেষ ফুলটি রওশন আকতার নাচনুর তখনো প্রস্ফুটিত হয়ে পৃথিবীর আলো দেখে নি।

বিজ্ঞাপন

মায়ের মুখে শুনেছি আমি নাকি বাবার অন্তঃপ্রাণ ছিলাম। বাবা যতক্ষণ পর্যন্ত কোলে নিতেন না ততক্ষণ আমি কাঁদতেই থাকতাম। কোলে নিয়ে আদর সোহাগে ভরিয়ে দিলে আমিও নাকি আমার ছোট্ট হাতে বাবার শ্বশ্রুমণ্ডিত মুখটা ছুঁয়ে আদর করতাম। তখন বাবার আঙ্গুল ধরে ছোট ছোট পায়ে হাঁটতে শিখেছি। সেই থেকে আজ অবধি আমার হাতে লেগে আছে বাবার হাতের ছোঁয়া।

সব আনন্দের ছন্দ পতন ঘটিয়ে সাড়ে তিন বছর বয়সে বাবার সাথে বিরহ-বিচ্ছেদ হয়ে গেল। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত বাবা পৃথিবীর মোহ মায়া কাটিয়ে সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আর আমরা নিপতিত হলাম ছাদবিহীন প্রখর সূর্যের নিচে বালুকাময় মরুভূমিতে। এরপর অসহায় পিতৃহীন তিন কন্যা আশ্রয় পেলাম জনমদুখিনী বিধবা মায়ের আঁচলের ছায়ায়। বাবা চলে যাওয়ার পনের দিন পর তার বাগানে ফোটা শেষ ফুলটি নাচনুরের জন্ম হলো।

বিজ্ঞাপন

বাবা নামটি উচ্চারিত হওয়ার সাথে সাথে যে কোনো বয়সী সন্তানের অন্তরে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা অনুভূত হয়। আমার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। নিরাপদ আশ্রয়টুকু চলে গেল একেবারে অবুঝ শিশু বয়সেই,তাই বন্ধু বান্ধবীরা সবাই বাবাকে নিয়ে আনন্দে আহ্লাদে ও স্মৃতি রোমন্থনে ব্যস্ত থাকলেও আমাদের সে সুযোগ ছিল না। আমাদের স্মৃতির ভান্ডার ছিল শূন্য। বাবাকে সাজাতে পারিনি ভাবাবেশের অলীকতায়। আঁকা হয়নি বাবা নামক বটবৃক্ষের হিমেল ছায়ার স্মৃতির কারুকাজ এবং বাবা– বাবা– বলে উষ্ণ বুকে আশ্রয় নিয়ে হৃদয় জুড়ানোর কোন গল্পও লেখার সুযোগ হয় নি।

তবে মা, নানু এবং আত্মীয় স্বজনের কাছে শুনেছি, ঊনিশ শত তিন সালের চব্বিশে জুলাই সাতকানিয়া থানার ঢেমশা গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে আমার বাবা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বুজরুচ মেহের চৌধুরী এবং মাতা ছিলেন মোছাম্মৎ হালিমা খাতুন।ঊনিশ শত সতের সালে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় চলে যান। পরে সেখান থেকে এসে চট্টগ্রাম আদালতে আইন পেশা শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন

বাবা ছিলেন প্রতিথযশা আইনজীবী, চট্টগ্রাম জেলা বার এসোসিয়েশনের সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য,পটিয়া মহকুমা সদর বারের সাধারণ সম্পাদক ও সাতকানিয়ার অবিভক্ত ঢেমশা ইউনিয়নের ছত্রিশ বছর যাবত দায়িত্ব পালন কারী প্রেসিডেন্ট বা চেয়ারম্যান।

তিনি অনেক জনহিতকর কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমার শিক্ষানুরাগী বাবা বিভিন্ন প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নিজের বত্রিশ কানি জমির উপর দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ সাতকানিয়া সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সাতকানিয়া ডাক বাংলো প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন।নিজের অর্থায়নে সাতকানিয়া বাসীর বহুল প্রত্যাশিত চেমন আরা সড়ক নির্মাণ করেন এবং কলেজ রোড সংলগ্ন নিজের জমির উপর দৃষ্টিনন্দন “মোজাফফর মোক্তার মসজিদ” নির্মাণ করেন। এছাড়া তিনি সাতকানিয়া এবং চট্টগ্রাম শহরের অনেক স্কুল, এতিমখানা ও মাদ্রাসার উন্নয়নের সাথেও জড়িত ছিলেন।

সমাজসেবা ও জনহিতকর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন পাকিস্তান সরকার থেকে তিনি সর্বশেষ্ট সমাজসেবক পদক” টি কে “(তমগায়ে খেদমত) উপাধিতে ভূষিত হন।সাতকানিয়া- লোহাগড়া সমিতি ঢাকা সহ বিভিন্ন সংগঠন বাবাকে মরণোত্তর পদকে ভূষিত করেছেন।

জাতীয় পার্টি আমলে সংসদ সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ইব্রাহিম বিন খলিল চৌধুরীর উদ্যোগে যোগাযোগ মন্ত্রী মাননীয় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে কলেজ পর্যন্ত সড়কটি “আলহাজ্ব মোজাফফর আহমদ চৌধুরী সড়ক” নামে উদ্বোধন করেন। আমরা সেজন্য ইব্রাহিম বিন খলিল চৌধুরীকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি।

বাবা ছিলেন খুবই ধর্মভীরু। প্রতিদিন ভোরে উঠে নামাজ পড়ে মুখস্থ কোরআন তেলোয়াত করে ‘মোক্তার বাড়ি’র ঘুরানো বারান্দা এবং বাগানে মর্নিং ওয়াক ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস।

বাবার চেহারার আদলসহ সবকিছু নাকি দাদা ভাইয়ের মতো ছিল। দাদা ভাইয়ের মতো বাবারও একটি ঘোড়া ছিল। বাবা গ্রামের বাড়ি গেলে গাড়ির হর্ণ শুনে ঘোড়াটি বাবাকে এগিয়ে নিতে আসত। বাবা চলে যাওয়ার পর ঘোড়াটি বাবার কবরের পাশে শুয়ে শুয়ে কাঁদত।পরে শুনেছি অল্প কদিন পর ঘোড়াটিও মরে গেছে।

চলাফেরায় বিলাসবহুল অত্যাধুনিক মডেলের বেশ দামী গাড়ি ব্যবহার, চলনে-বলনে, কথা-বার্তায় আভিজাত্যতা রক্ষা করে চললেও বাবা ছিলেন গরীবের অন্তঃপ্রাণ। আদালতে গরিব ও নির্যাতিত মানুষের অভিযোগ প্রাথমিক দৃষ্টিতে সত্য প্রতীয়মান হলে তিনি বিনা ফিতে মামলা পরিচালনা করে তাদের অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক নজির রেখে গিয়েছিলেন।
বাবার দরজা নাকি মেহমান ও গরিবদের জন্য সব সময় খোলা ছিল। কেউ নাকি কোন সময় না খেয়ে ঘর থেকে যেতে পারে নি।
তাছাড়া অসংখ্য গরিব মেয়েকে নিজ খরচে বিয়ে দিয়ে কন্যা দায়গ্রস্ত পিতাকে উদ্ধার করেছেন।

আমার বাবা ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। ঊনিশ শত একাত্তর সালের একুশে অক্টোবর বাবার চলে যাওয়ার খবর শুনে চট্টগ্রামে বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামে নেমে এসেছিল শোকের ছায়া। শুরু হয়েছিল শোকের মাতম। সর্বশ্রেণীর মানুষের অংশ গ্রহণে বিশাল জানাযার নামাজে তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ মিলে।
মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে বাবাকে হারানো যে,কত বেদনাদায়ক, কত কষ্টকর তা একমাত্র আমাদের মত শিশু বয়সে পিতৃহারা সন্তানরাই জানে।
আমাদের বৈঠক খানায় রাখা সাদা কাফনে জড়ানো বাবার মায়াভরা মুখটা ছাড়া তেমন কোন স্মৃতি মনে না পড়লেও মা,নানু, আত্মীয় স্বজন, মরহুম এডভোকেট বদিউল আলম এবং বাবার বন্ধু আমার খালু মরহুম এডভোকেট আহমেদুর রহমান সাহেব থেকে বাবার শৌর্য বীর্যের কথা জানতে ফেরেছি।আজ আমি শ্রদ্ধার সাথে তাঁদের স্মরণ করছি। বাবা সম্পর্কে জানা সবার বর্ণনা মতে বাবাকে আমার মানসপটে আঁকতে চেষ্টা করেছি।

“বাবা ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সিংহ পুরুষ। আইনের শাসন প্রত্যাশী প্রতিথযশা আইনজীবী, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা বিস্তারে সংগ্রাম রত শিক্ষানুরাগী, সব ধরণের কল্যাণ কাজে সাহায্যকারী দানবীর, সমাজ সংস্কারে বিভোর সমাজসেবক, গরিবের দুঃসময়ে সাহায্য কারী গরিবের বন্ধু, উন্নয়নের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সাহসী, স্পষ্টবাদী,ধর্মভীরু, নিরহংকারী, অসম্ভব জনপ্রিয় ও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী একজন নেতা ছিলেন।”

আমার মরহুম বাবা মোজাফফর আহমদ চৌধুরী টি কে আমাদের আদর্শ, আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব ও আমাদের প্রেরণা। এমন একজন ক্ষনজন্মা খ্যাতিমান পুরুষের ঔরসে জন্ম গ্রহণকরে আমরা আজ ধন্য।

মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে শোকরিয়া আদায় করছি। আপনারা সবাই আমাদের মরহুম বাবার জন্য দোয়া করবেন। “রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানী সাগিরা।” আল্লাহ আমাদের বাবাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করুন। আমিন।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

Please enter your comment!
Please enter your name here

বিজ্ঞাপন

সর্বশেষ সংবাদ

x