বুধবার ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

মহান মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর

অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার

প্রকাশিত: ১৬:১৯, ৯ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ১১:১৯, ১১ জুলাই ২০২৬

মহান মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর

মহেষখলা স্মৃতিসৌধ। ছবি: সংগৃহীত

বাঙালি জাতির রয়েছে এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য—তা হলো, অধিকারের প্রশ্নে সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা এবং দুর্বার গতিতে আন্দোলনে যুক্ত হওয়া। এই ঐতিহ্যের ধারা মেনেই ১৯৭১ সালে বাঙালিরা পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।মধ্যনগর থানার স্বাধীনতাকামী জনতা ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের মূল বার্তা অনুধাবন করার পরই বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্বাধীনতার জন্য তাঁদের যুদ্ধে যেতে হবে। এর ফলস্বরূপ, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে মধ্যনগর থানাবাসীর বিন্দুমাত্র বিলম্ব হয়নি। মধ্যনগর থানা ছিল ১১ নং সেক্টরের মহেষখলা ক্যাম্পের(সাব-সেক্টর) অধীন। ভারতের সীমান্তঘেঁষা ও হাওরবেষ্টিত দুর্গম জনপদ হওয়ায় এটি ছিল মুক্তাঞ্চল। মহেষখলা ক্যাম্পটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তিশালী ঘাঁটি।এই ক্যাম্পটি ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাঘমারা জেলার মহেষখলা থানা ও বাংলাদেশ অংশের মহেষখলা মিলিয়ে।

কাগমারী সেনা নিবাসের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ: মহেষখলা আশ্রয় শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি পরিচালিত হতো সম্পূর্ণরূপে নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বদের দ্বারা।  ভারত সরকার বা আন্তর্জাতিক রেডক্রস সংস্থা এর দায়িত্ব নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প কমিটিই এটির সম্পূর্ণ পরিচালনার কাজ করতো। তাই মহেষখলা ক্যাম্পের জন্য  অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী স্থানীয়ভাবেই সংগৃহীত হতো। জনাব মেহের আলীর নেতৃত্ত্বে জনাব মোঃ আকিকুর রেজা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে ট্রেনিং এর জন্যে পাঠাতেন । মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ আকিকুর রেজা ১৯৭১ সালে পূর্তমন্ত্রনালয়ের অভ্যন্তরীন অডিট শাখায় অডিটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ২৬ শে মার্চের ভাষনের পর পাকিস্তান সরকারের চাকুরী না করার সিদ্ধান্ত নেন। ২৭শে মার্চ মেজর শফিউল্লাহর গাড়ীতে টঙ্গী ব্রীজ হয়ে টাঙ্গাইলে আসেন। পরবর্তীতে ট্রাকে করে তার শ্বশুর বাড়ী ময়মনসিংহ আসেন।

ময়মনসিংহের কাগমারী সেনাবাহিনীতে আক্রমনকারীদের সাথে মিলিত হয়ে সেনা নিবাসের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। ০৪/০৪/১৯৭১ সেনাবাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক কষ্ট করে তার গ্রামের বাড়ী দুগুনৈ গ্রামে পৌঁছায় যাহা কিনা সুনামগঞ্জ মহকুমার মধ্যনগর থানার অন্তর্গত। এখানে এসেই সাক্ষাত হয় নেত্রকোণা সংগ্রাম কমিটির সম্মানীত  সদস্য এবং মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের অন্যতম  সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা মেহের আলীর[৮] [৯]সাথে । জনাব মেহের আলী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে ভারতের মহেশখলা যাওয়ার পথে মধ্যনগর থানার দুগনৈ গ্রামে তাঁর শ্বশুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মধ্যনগর সহ আশপাশএলাকার ছাত্র যুবকদেরকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করবার জন্য। জনাব মেহের আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা থাকালীন জনাব রেজা ও জনাব রেজার খালাত ভাই বীরমুক্তিযোদ্ধা জনাব আজিজুর রহীম (স্বাধীনতার পর যিনি বাংলাদেশ সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব প্রদান করেন) ও জনাব রেজার ভগ্নিপতি জনাব মোঃ আলী (স্বাধীনতার পর যিনি বাংলাদেশ জয়েন্টস্টক কোম্পানীর প্রধান হিসেবে অবসর গ্রহন করেন ও কর্নেল হাবিবুর রহমান-তারেকের পিতা) সহ অন্যান্যদেরকে স্বাধীনতার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেন এবং জনাব মেহের আলীর নেতৃত্বে জনাব রেজা অন্যান্যদের নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে সতর্কতার সাথে অংশ গ্রহণ করতেন ।

জনাব মেহের আলীর মধ্যে নেতৃত্বের অসাধারন গুনাবলী ছিল। মানুষ তাঁর কথা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনত। তিনি নেত্রকোনাতে যেমন মানুষকে স্বাধীকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত করেছেন তেমনি মধ্যনগরের  মানুষের কাছে, ছাত্র ও যুব সমাজের  কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। তাঁর শ্বশুর বাড়ী মধ্যনগর থানার দুগনৈ গ্রামে হওয়ায় তিনি স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই এই অঞ্চলের মানুষকে স্বাধীকার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করতে থাকেন। বীরমুক্তিযোদ্ধা মেহের আলী মহেষখলা ক্যাম্পের ইয়ুথ, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ও রিফিউজি ক্যাম্প পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  জনাব মেহের আলীর শ্বশুরের পরিবারটি ঐ অঞ্চলের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ধনী হওয়ায় তিনি এই অঞ্চলের ছাত্র যুব সমাজকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বূদ্ধ করা, সাময়িকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা, নৌকায় পরিবহনের ব্যবস্থা ও মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনার জন্য খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহের দায়িত্ব নিয়ে এই অঞ্চলে আসেন।

মহেষখলা ক্যাম্পের ( ১১ নং সেক্টরের সাব-সেক্টর) দায়িত্ত প্রাপ্ত নেতৃত্ববৃন্দের তালিকা : ১১ সদস্য বিশিষ্ট মহেষখলা ক্যাম্প[১০][১১]পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্য যারা ছিলেন – মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব নেত্রকোণার ১. ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ(সভাপতি-জুন – ডিসেম্বর), ২. সুনামগন্জের(ধর্মপাশা) আব্দুল হেকিম চৌধুরী(সভাপতি-এপ্রিল – জুন),৩. এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের (নেত্রকোণা), ৪. বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী, ৫. মোঃ মেহের আলী ( নেত্রকোণা সদর), ৬. ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত,(নেত্রকোণা সদর),৭. জনাব আব্দুল কুদ্দুস আজাদ (মোহনগঞ্জ), ৮. জনাব নুরুজ্জামান চিশতী (বারহাট্টা),৯. জনাব মারাজ মিয়া চেয়ারম্যান,১০. জনাব ইনসান উদ্দিন খান(বারহাট্টা),  ১১. আব্দুল বারী তলুকদার(নেত্রকোণা সদর) । পরবর্তীতে জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী টেকেরঘাট ক্যাম্পে চলে যান । উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল মমিন -এমপি, নেত্রকোনার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক এমপি, কিশোরগঞ্জের এমপি আব্দুল কাদের, নেত্রকোনার হাদিছ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মহেষখলা হয়ে ইন্ডিয়া চলে যান এবং কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে মু্ক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দায়িত্ত্ব পালন করতে থাকেন।

ভারতীয় বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন চৌহান মাঝে মাঝে মহিষখলা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতেন। পরবর্তীতে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মুজিব বাহিনী গঠনের পর মহিষখলা সাব-সক্টরের অধীনে মহিষখলা ফরেস্ট অফিসের নিকট স্থাপন করা হয় মুজিব বাহিনী ক্যাম্প। সর্বজনাব গোলাম এরশাদুর রহমান ও হায়দার জাহান চৌধুরী ছিলেন মুজিব বাহিনী নেত্রকোণা জোনের কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার। আর তোরার নিকটস্থ খেরাপাড়া ছিল মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর। খেরাপাড়াতে ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ জোয়ারদার বাবুল নেত্রকোণার পক্ষে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ,শেরপুর,জামালপুর ও টাঙ্গাইল নিয়ে গঠিত অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিনায়ক। মুজিব বাহিনীর মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সর্বজনাব রুহুল আমীন (নেত্রকোণা সরকারী কলেজের বর্তমান সিনিয়র প্রভাষক), মোহনগঞ্জের প্রাক্তন জাসদ নেতা গোলাম রব্বানী চৌধুরী, এ,কে,এম আশ্রাব আলী (আবুল কুরেশ) ও সচিব উজ্জ্বল কুমার দত্ত। কিছুদিনের জন্য শিবগঞ্জ রোডের স্বনামধন্য কৌতুকাভিনেতা সিরাজ উদ্দিন, মতিয়র রহমান তালুকদার,মোস্তাফিজুর রহমান রেজভী,সুলতান নুরী , খন্দকার আনিস, মনজুর উল হক ও নজরুল ইসলাম খানসহ আরো অনেকেই ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। এই ক্যাম্পেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরকে রিক্রুট করে উন্নত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য সিনিয়রদেরকে দেরাদুন এর তান্ডুয়া আর জুনিয়রদের আসামের হাফলং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুজিব বহিনীর প্রশিক্ষণ মুক্তিবাহিনী অপেক্ষা ভিন্নতর ছিল। মুজিব বাহিনী পরিচালনার জন্য সকল ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হতো তৃণমূলের কমান্ড স্ট্রাকচার। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব মুজিব বাহিনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়। মুজিব বাহিনী ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের জয়লাভের পরিকল্পনার ফসল।   

মহেষখলা ক্যাম্পের আশ্রয় শিবিরে প্রায় দুই লাখের উপরে মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। মহেষখলা আশ্রয় শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি পরিচালিত হতো সম্পূর্ণরূপে নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বদের দ্বারা,  ভারত সরকার বা আন্তর্জাতিক রেডক্রস সংস্থা এর দায়িত্ব নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প কমিটিই এটির সম্পূর্ণ পরিচালনার কাজ করতো। মুক্তিফৌজ রিক্রট করা (ভর্তি) এবং তাদের আশ্রয় ও প্রাথমিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এ ক্যাম্প কমিটি চালাতো। ট্রেনিং পরিচালনার প্রাথমিক ব্যবস্থা ও তাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানো (তুরাতে) এবং ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে ফিরে আসার পর ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল, সিলেটের পশ্চিমাঞ্চল অভ্যন্তরে আক্রমণ পরিচালনার জন্য নৌকা সংগ্রহ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সকল রকম দায়িত্ব সুষ্ঠভাবে পালন করতো এখানকার এই ক্যাম্প কমিটি।নতুন ভর্তি করা মুক্তিফৌজদের ট্রেনিং সমাপ্তির পর প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা ক্যাম্প ছিলো। এখানেই তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থ সংগ্রহ, রিক্রট ও দেশের অভ্যন্তরে যোদ্ধাদের প্রেরণ তাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শরণার্থীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপকমিটি গঠন করে বিভিন্ন সদস্যদের উপর ভার দেওয়া হতো। সে উপ কমিটিগুলো তাদের নির্বাচিত কার্য সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করতো।

ক্যাম্প কমিটি প্রতিদিনই একবার কাজ পরিদর্শন এবং তাদের কাজের সমন্বয় সাধন করতো। সে সব উপ কমিটির সদস্য যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন সর্বজনাব – ধর্মপাশার শওকত আলী, মণীন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী, খালিয়াজুড়ির বিমলেন্দ্র রায় চৌধুরী, রাজাপুরের মহারাজ মিয়া, মোহনগঞ্জের প্রিন্সিপ্যাল তারা মিয়া, মহরম আলী, বিষ্ণুপুরের অক্ষয় কুমারসহ, বংশীকুন্ডার হামিদপুরের আলী আকবর, সানুয়ার বসন্ত দাশ গুপ্ত, মোহনপুরের দিলু মড়ল, রাফায়েল মাস্টার, বনগাঁর আব্দুল হক, বারহাট্টার সেকান্দর নূরী, কার্তিকপুরের রাইজুদ্দিন মেম্বার, মহিষখলার কালা মিয়া মড়ল, আব্দুর রশিদ, শ্রীপুরের সুধীর চন্দ্র হাজং, সুমাই গিরি, সাউদপাড়ার ইয়াকুব আলী পঞ্চায়েত, কালীপুরের শাহাব উদ্দিন মহালদার, মোহনপুরের কেনারাম হাজং, হরিপদ বানাই, রামপুরের ছমির ফকির প্রমুখ। মহিষখলায় (বাংলাদেশের এবং মেঘালয়ের মুক্তাঞ্চল) তখন লক্ষাধিক শরণার্থী। এখানকার ক্যাম্প পরিচালণা পর্ষদ নিজেরাই শরনার্থীরা জন্যে সকল ব্যবস্থা করতো। কোনরূপ বাইরের সাহায্য পাবার সুযোগ সেখানে ছিল না। পরবর্তীতে ক্যাম্পের কাজকে তরান্বিত ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা , অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে দ্রুত ট্রেনিংয়ের জন্যে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রতিটি থানা ও গ্রামে গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেয়া হয় ।

দুগনৈ গ্রামে সংগ্রাম পরিষদ গঠন: জনাব  মেহের আলী মোঃ আকিকুর রেজাকে পেয়ে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠনের প্রস্তাব করেন। জনাব মোঃ মেহের আলী মোঃ আকিকুর রেজাকে সভাপতি ও জনাব আব্দুল আওয়ালকে সাধারণ সম্পাদক করে মধ্যনগর থানায় প্রথম দুর্গনৈ গ্রামের সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। ঐ কমিটির অন্যান্য সদস্য যারা ছিলেন তারা হলেন-সর্বজনাব – ১.জনাব মোঃ আজাদুর রেজা(তার এক ছেলে দেশের একটি প্রসি্দ্ধ গ্রুপ অব কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এক জামাতা বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের উকিল),  ২. জনাব মোঃ এখলাছ উদ্দিন চৌধুরী,৩. জনাব মোঃ আজনুর,  ৪, জনাব মোঃ মান্নান আলী,৫. জনাব মোঃ তকসির,৬. জনাব মন্তাজিদ চৌধুরী, ৭. জনাব মোঃ কাঁচামনি, ৮. জনাব মোঃ আদম, ৯. জনাব মোঃ দুলই,১০. জনাব মোঃ পান্ডব আলী, ১১. জনাব মোঃ মহশিব আলী,১২. জনাব হাফেজ মোঃ মতিউর রহমান চৌধুরী,১৩. জনাব মোঃ মতিউর রহমান,১৪. জনাব মোঃ আব্দুল হাজির। সুনামগন্জ জেলার প্রখ্যাত আইনজীবি জনাব আব্দুল মতিন চৌধুরী (তার দুই ছেলে সুনামগন্জ ও সিলেটের প্রখ্যাত আইনজীবি) সব সময় তাদেরকে মূল্যবান উপদেশ দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন।

ক্যাপ্টেন গণীর দুগনৈ গ্রামে আগমন: সম্ভবত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে  ক্যাপ্টেন গণী ১৫০ জন ইসি সদস্য নিয়ে দুগনৈ গ্রামে আসেন। জনাব মেহের আলীর নেতৃত্বে এবং নিদের্শনায় তাদের সকলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় দুদিন দু-রাতের জন্যে। পরবর্তীতে মেহের আলীর নির্দেশে তাদের জন্যে নুর মিয়া চৌধুরীর বাড়ীতে মাছিমপুর ও কান্দা পাড়ায় ৩য় দিন তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ৪র্থ দিন মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের দিয়ে নিরাপদে তাদের ভারতের তুরায় যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ক্যাপ্টেন গণীর কাছে জনাব রেজা জানতে পারেন যে  তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেজর জেনারেল (অব.) ইজাজ আহমেদ চৌধুরী[১৩]  ( পরবর্তীতে আশ্রমবাড়ি সাব সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পান) আশ্রমবাড়ি সাব সেক্টরের দায়িত্বে আছেন।খুব শীঘ্রই তিনি তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। পরবর্তীতে জনাব ইজাজ জনাব রেজার মাধ্যমে   ক্যাপ্টেন মান্নান ও মহেষখলা ক্যাম্পের উর্ধতন পরিচালকবৃন্দ তথা জনাব মেহের আলী, খালেকদাদ চৌধুরীর সাথে অত্যন্ত গোপনে তথ্য আদান প্রদান করতেন। তথ্য আদান প্রদানকারী হিসেবে কাজ করেছেন জনাব সৈয়দ আলী তাং ও হাজী গাজী নবী নওয়াজ।উল্লেখ্য যে মেজর জেনারেল (অব.) ইজাজ আহমেদ চৌধুরী  জনাব রেজা ও মধ্যনগরের সাবেক কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা জনাব নুরুল ইসলামের মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে গেছেন।

মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন: পরবর্তীতে জনাব মেহের আলী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে  জনাব মোঃ আকিকুর রেজা ভূইয়াকে সভাপতি (যিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ের আমলা হিসেবে অবসর গ্রহন করেন।) ও জনাব আব্দুল আওয়ালকে সহ-সভাপতি (পরবর্তীতে তিনি ধরমপাশা উপজেলার দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন-উল্লেখ্য-তার এক মেয়ে ডাক্তার ও জামাতা সেনবাহিনীর কর্নেল)  এবং শ্রী দূর্গেশ কিরণ তালুকদার বাদলকে (মধ্যনগর বাজার – তার এক ছেলে মধ্যনগর থানার প্রভবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা) সেক্রেটারী করে মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। এই কমিটিতে অন্যান্য যারা ছিলেন সর্বজনাব- সহ সভাপতি : শ্রী হেম চন্দ্র রায় (মধ্যনগর বাজার- তার এক ছেলে মধ্যনগর থানার প্রভবশালী রাজনৈতিক নেতা ), সহ সভাপতি : শ্রী ললীত মোহন রায় (মধ্যনগর),সহ সভাপতি : আক্কেল আলী তালুকদার (বংশীকুন্ডা),সহ সাধারণ সম্পাদক : শ্রী পরিতুষ রায় (মধ্যনগর বাজার),সহ সাধারণ সম্পাদক : শ্রী প্রতাপ চন্দ্র দাস (খালপাড়া শিয়ালকান্দা),সাংগঠনিক সম্পাদক : আব্দুল আজিজ (মধ্যনগর বাজার),সহ সাংগঠনিক সম্পাদক : আব্দুল আজিজ (পিপড়াকান্দা),সহ সাংগঠনিক সম্পাদক : এখলাছ চৌধুরী (দুগনই),অর্থ সম্পাদক : মতিউর রহমান চৌধুরী হাফেজ (দুগনই- তার এক ছেলে একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানীর Chief Financial Officer-CFO,আরেক ছেলে প্রতিষ্ঠিত ব্য়বসায়ী ),সহ অর্থ সম্পাদক : শ্রী গয়নাথ চন্দ্র দাস (গোল্লা),দপ্তর সম্পাদক : হাতেম আলী মেম্বার (উত্তর বংশীকুন্ডা),সহ দপ্তর সম্পাদক : হাছান আলী মাষ্টার (উত্তর বংশীকুন্ডা),সদস্য সচিব : আব্দুল হক শাহ্ (বনগাঁও),তথ্য সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী রঘুনাথ কানু (মধ্যনগর বাজার),সহ তথ্য সংগ্রহ সম্পাদক : সত্য  নারায়ণ কানু (মধ্যনগর বাজার),সহ তথ্য সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী অমর টেইলার (মধ্যনগর বাজার),

আপ্যায়ন সম্পাদক : শ্রী অধিগুপ্ত (জমশেদপুর),রসদ সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী সমরেন্দ্র ভট্টাচার্য (মধ্যনগর বাজার),সহ রসদ সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী যুগেশ সরকার (মাছিমপুর),সহ রসদ সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী ফুলের দত্ত (গোলাইখালী),স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক : আব্দুল করীম তালুকদার (আবিদনগর শিয়ালকান্দা),সহ স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক : শ্রী সত্যপদ রায় (মধ্যনগর বাজার),সহ  ̄স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক : আব্দুর রেজ্জাক টেইলার (মধ্যনগর বাজার) ,যোগাযোগ ও পরিবহণ সম্পাদক : শ্রী গোপাল বণিক (মধ্যনগর বাজার),সহ যোগাযোগ ও পরিবহণ সম্পাদক : শ্রী শীতেশ চন্দ্র রায় (মধ্যনগর বাজার),প্রচার সম্পাদক : শ্রী প্রদীপ তালুকদার (মাছিমপুর),সম্মানিত সদস্য: শ্রী নৃপেন্দ চন্দ্র রায় (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য : শ্রী চম্পা বনিক (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: শ্রী যাদু মালাকার (ইটাউরী),সম্মানিত সদস্য: শ্রী সমর বিজয় রায় (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: শ্রী  ̄স্বদেশ রায় (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: আব্দুল ছাদেক (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালিব (মধ্যনগর),সম্মানিত সদস্য : বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ তালুকদার (সাজদাপুর)। মধ্যনগর এলাকাটি ছিল বেশ দূর্গম।বর্ষাকাল নৌকা ও শুকনো মওসমে পায়ে হাটা ছাড়া আর কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। তাই এখানে পাকসেনারা আক্রমণ করার সাহস পায়নি।তবে পাকসেনাদের দোসরেরা বেশ সক্রিয় ছিল।তারা লুটতারাজ ,খুন রাহাজানী করে বেড়াত। মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর নেতৃবৃন্দ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করে। মজুদদারেরা জাতে নিত্যপণ্য সামগ্রী মজুত করে চরা দামে বিক্রি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রেখে রেশনীং ব্যবস্থা চালু করা হয়। মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ পাড়া মহল্লায় পাহরার ব্যবস্থা করে যাতে দষ্কৃতীকারীরা মানুষের ক্ষতি করতে না পারে।পাশাপাশি তারা অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে ট্রেনিং এর জন্যে পাঠাতে থাকে ।

ক্যাপ্টেন মান্নানের অধীনস্থ নেতৃত্ববৃন্দের তালিকা: মহেষখলার ১১নং সেক্টরের সামরিক কমান্ডের দায়িত্তে ছিলেন মেজর আবু তাহের এবং যুদ্ধের শেষের দিকে দায়িত্ত নেন মেজর জিয়া। এই সেক্টরের দক্ষিণাংশে ক্যাপ্টেন মান্নান তার অধীনস্থ ১৫০ জন ই পি আর এবং সংগৃহীত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করেন।এই দলটির অন্যান্য যারা নেতৃত্তে ছিলেন তারা হলেন সর্বজনাব– ১.সুবেদার নায়ক মোজাফর আহমেদ ২. সুবেদার মোঃ মুরশেদ  ৩.সামরিক টেনিং মাস্টার মাহাতাব উদ্দীন ৪. সামরিক ডাক্তার আনছার আলী। এই ক্যাম্পের অধীনে সুনামগঞ্জের পশ্চিমাংশ, নেত্রকোনার উত্তরাংশে  প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কার্য্যক্রম বহাল রাখেন ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ইং পর্যন্ত।

মহেষখলা ক্যাম্পে খাদ্য সামগ্রী প্রেরণ: মহেষখলা আশ্রয় শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি পরিচালিত হতো সম্পূর্ণরূপে নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বদের দ্বারা।  ভারত সরকার বা আন্তর্জাতিক রেডক্রস সংস্থা এর দায়িত্ব নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প কমিটিই এটির সম্পূর্ণ পরিচালনার কাজ করতো। তাই মহেষখলা ক্যাম্পের জন্য  অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী স্থানীয়ভাবেই সংগৃহীত হতো। জনাব মেহের আলীর নেতৃত্ত্বে জনাব মোঃ আকিকুর রেজা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে ট্রেনিং এর জন্যে পাঠাতে থাকেন। নেতৃবৃন্দ   ঐ সময় জনাব রহমত আলী তালুকদার, জনাব আক্কেল আলী তালুকদার ও আব্দুর রউফ চৌধুরীর কাছ থেকে ১৩০০ মন ধান, ১০০০ মন লাখড়ী, ৩০০শত সিরামিকের খাবার প্লেট, ৫০টি বড় চামুচ,গরু, ছাগল, মাছ ,মুরগী মহেষখালা ক্যাম্পে পাঠান যা ক্যাম্প পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। জনাব মেহের আলীর নিহতের পরপরই জনাব রহমত আলী তালুকদার , জনাব আক্কেল আলী তালুকদারের বাড়ীটি দুই দুই বার লুট করা হয়। লুটেরারা তাদের প্রায় সবকিছু নিয়ে যায়। পরবর্তীতে মহেষখলা ক্যাম্পের বীরমুক্তিযোদ্ধারা বিষয়টি জানতে পেরে অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেন। দ্রুত সে সবের কিছু  উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন। যার বর্নণা মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্যবৃন্দসহ উপরোল্লেখিত জাতীয় ব্যক্তিদের লেখা ও বক্তব্য থেকে জানা যায়।

মেজর এম এ মোত্তালিবের দুগনৈ গ্রামে আগমন: এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে মেজর মোত্তালিবের (পরবর্তীতে যিনি সাব সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন) নেতৃত্বে কয়েকশ’ সামরিক কর্মকর্তা ও ইপিআর সদস্য দুগনৈ গ্রামে আসে।মেজর মোত্তালিব[১৪] নেত্রকোনার পূর্বধলা থানার কাজলা গ্রামের বাসিন্দা এবং মেহের আলীর ঘনিষ্ঠ বড় ভাই। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী ছিলেন। এলাকার মানুষ মেজর সাহেবের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দেখে মুক্তিযু্দ্ধে যাওয়ার জন্যে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হয়। মেজর মোত্তালিব এলাকার মানুষকে যার যা আছে তা নিয়ে মুক্তিযু্দ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্যে আহবান জানান। জনাব মেহের আলী মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের জনাব আকিকুর রেজা ও আব্দুল আওয়ালসহ অন্যাণ্য নেতৃবৃন্দের নিয়ে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং পরের দিন তাদেরকে নৌকায় করে নিরাপদে গন্তব্যে  যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এর কিছুদিন পর জনাব মেহের আলী মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদের সমস্ত দায়িত্ব জনাব আকিকুর রেজার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে মহেষখলা ক্যাম্পে চলে আসেন তাঁর উপর অন্যান্য দায়িত্ব পালনের জন্য। মেহের আলীর নির্দেশক্রমে জনাব আকিকুর রেজা তার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব স্বচ্ছতার সাথে পালন করতে থাকেন। পূর্বের মতোই তিনি  অন্যান্য জেলা হতে আগত ভারত গামী মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ও ক্যাম্পে খাদ্য সামগ্রী প্রেরণ করতে থাকেন। খাদ্য সামগ্রী ছিল ইয়ুথ ক্যাম্প, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ও রিফিউজি ক্যাম্প পরিচালনার অন্যতম রসদ যাহা ছাড়া যুদ্ধই পরিচালনা করা সম্ভব হতো না।

মধ্যনগর উপজেলার বীরমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা: মধ্যনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব  কমান্ডার মোঃ নুরুল ইসলাম, মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি জনাব মোঃ আকিকুর রেজা ভূইয়া (যিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ের আমলা হিসেবে অবসর গ্রহন করেন।), ইউনুছ মিয়া,মোঃ আতাউর রহমান, মোঃ আব্দুল জব্বার, মোঃ আব্দুল বারী খন্দকার, মোঃ মোতালেব, মোঃ নূরুল হক, মোঃ আব্দুর রহিম, বীরবল চন্দ্র দাস, মোঃ সুরুজ আলী, শুধাংশু রঞ্জন বিশ্বাস,  নুরুল ইসলাম , মরুহম আব্দুর রউফ, কমান্ডার মোঃ নুরুল ইসলাম, মোঃ গাজী আব্দুল হক, মোঃ পান্নু মিয়া,মোহাম্মদ আলী, আলী আমজাদ,বেণু ভূষণ দাস, রমা রাণী দাস প্রমুখ।

বীরমুক্তিযোদ্ধা মেহের আলীর শাহাদাৎবরন: ১৯/০৫/১৯৭১ জনাব আকিকুর রেজা প্রায় ২০০ যুবককে নিয়ে মহেষখলায় ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে তারা জানতে পারেন যে, জনাব মো্ঃ মেহের আলী মহেষখলা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন কালে ১৭ ই মে ১৯৭১ সালে আততায়ীর গুলিতে শহীদ হয়েছেন। এই সংবাদ শুনার পর, তার সাথে থাকা যুবকেরা ভয় পেয়ে যায় এই ভেবে যে,আততায়ীরা যদি তাদের নেতাকে মেরে ফেলতে পারে তবে তারা তাদেরকেও মেরে ফেলবে। পরে তারা ঐ জায়গা হতে যে যার মত বাড়ী ফিরে যায়।

মধ্যনগরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা: বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলী শহীদ হওয়ার পর দুগনৈ গ্রামে তার শ্বশুর বাড়ীটি দুই দুই বার লুট করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার অপরাধে ও পূর্বশত্রুতার জেরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাতজন বীর সহযোদ্ধাকে দুষকৃতিকারীরা (যাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় লুন্ঠন ও নিরাপরাধ মানুষদেরকে হত্যার বহু অভিযোগ ছিল) হত্যা করে।  শহীদ মেহের আলীসহ যে সকল সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তারা হলেন – শহীদ তাজনুর,শহীদ কাচা আবু,শহীদ সল্লুক চৌধুরী, শহীদ লাল চান, শহীদ আব্দুল লতিফ, শহীদ আব্দুল হাসিম ও শহীদ আব্দুল বাহার।

বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত জাতীয় সাহিত্যিক জনাব খালেকদাদ চৌধুরীর দুগনৈ গ্রামে আগমন: মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলীর নিহতের পর কোন একদনি বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত জাতীয় সাহিত্যিক ও মহেষখলা ক্যাম্পের পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য জনাব খালেকদাদ চৌধুরী জনাব মেহের আলীর শ্বশুরের বাড়ীতে যান । আকিকুর রেজা জনাব চৌধুরীকে মেহের আলীর শ্বশুরের বাড়ী লুটের ঘটনাটি খুলে বলেন। উনাকে বলেন কিভাবে তাদের বাড়ীর ও এলাকার মেয়েদেরকে লাঞ্চিত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়া ও সার্বিকভাবে সহায়তা করার অপরাধে কিভাবে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। এরই মধ্যে জনাব খালেকদাদ চৌধুরীর উপস্থিতির কথা জানতে পেরে শত শত লোক জনাব মেহের আলীর শ্বশুরের বাড়ীতে হাজির হয়। তারা তাদের প্রিয় নেতা মেহের আলীর হত্যার বিচার চায় এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবী করে। জনাব  চৌধুরী তাদের কথা ধৈর্য্য সহকারে শুনেন এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের আশ্বাস প্রদান করেন।

জনাব চৌধুরী মেহের আলীর শ্বশুরের পরিবারের সদস্যবৃন্দসহ দুগনৈ গ্রামের এলাকাবাসীর প্রতি মুক্তিযোদ্ধারের থাকা খাওয়া ও ক্যাম্প পরিচালনায় বিভিন্ন ভাবে সহায়তার জন্যে ধন্যবাদ জানান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, আপনাদের অবদান জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। তাদের লুট হয়ে যাওয়া সম্পদ উদ্ধারের জন্যে তিনি সরবাত্তক চেষ্টা করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি নিয়ে মহেষখলা ক্যাম্পের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডাঃ আখলাক হোসেন, আব্দুল হেকিম চৌধুরীর সাথে কথা বলেন। তারা বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় লুটে যাওয়া কিছু সম্পদ ফিরিয়ে দেন। যার বর্নণা মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্যবৃন্দসহ উপরোল্লেখিত জাতীয় ব্যক্তিদের লেখা ও বক্তব্য এবং অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার সম্পাদিত গবেষণাধর্মি পত্রিকা র্বিজয় একাত্ত্বরে প্রকাশিত নেত্রকোণা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দীর্ঘদিনের কমান্ডার হায়দার জাহান চৌধুরীর লেখক প্রবন্ধ ” মহেষখলা ক্যাম্প ও মুক্তিসংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী এবং মেহের আলী প্রসংগ”-থেকে পাওয়া যায়।

মধ্যনগরে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক: মহেষখলায় সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২-১৩ সালে নির্মিত হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মৃতিসৌধ। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র(Bangladesh Muktijuddho Research Institute,Australia – এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান)–এর মাধ্যমে অত্র্র এলাকার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ক্যাম্প, মধ্যনগর, দুগনৈসহ অন্যান্য গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম ও মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানের কথা সবিস্তারে জানতে পারে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র- এর উৎসাহ ও উদ্দীপনায় এলাকাবাসী ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ স্মৃতি পরিষদ-সুনামগঞ্জ,মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার ও শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাব-দুগনৈ,মধ্যনগর নামে তিনটি সংগঠন গড়ে তুলে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র  “মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার” ও “শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাব” নামক প্রতিষ্ঠান দুটিকে বই পুস্তক ও খেলাধুলার সামগ্রী দিয়ে সার্বিকভাবে সহায়তা করছে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, শহীদ স্মৃতি পরিষদ-সুনামগঞ্জ,মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার ও শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাবের মাধ্যমে ক্রীড়া ও অত্র এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী সংগ্রহ ও  বীর মুক্তিযোদ্ধা , মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের সদস্য ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মান্না এবং আর্থিক অনুদানের প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। মধ্যনগর ও মহেষখলা ক্যাম্পের ঘটনাবলী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী  নিয়ে “মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না” নামে একটি বই প্রকাশ করেছে।

আরও পড়ুন: মহান মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা

দুর্জয় বাংলা


Notice: Undefined variable: sAddThis in /home/durjoyba/public_html/details.php on line 859