বুধবার ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠের আওয়াজ এখনও নেত্রকোণার হাওরে ঢেউ তুলে

বীর মুক্তিযোদ্ধা উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত

প্রকাশিত: ২২:০৮, ১২ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ২৩:০২, ১২ জুলাই ২০২৬

বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠের আওয়াজ এখনও নেত্রকোণার হাওরে ঢেউ তুলে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গবন্ধুর নেত্রকোণায় প্রথম আগমন ১৯৫৩ সালে। ময়মনসিংহ থেকে তিনি সড়ক পথে নেত্রকোণা এসেছিলেন এবং শহরের নিকটবর্তী পারলা গ্রামে প্রবেশের সাথে সাথেই মুসলিমলীগের গুন্ডবাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হন। পারলা গ্রামের জোতদার বাবু যোগেশ চন্দ্র তালুকদারের বাড়ির সামনেই শেখ মুজিবকে বহনকারী গাড়িটি আক্রান্ত হয়। পরিস্থিতির জটিল আকারে পৌঁছে গেলে যোগেশ চন্দ্র তালুকদার তাঁর দুনালা বন্দুক দিয়ে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করতে শুরু করলে গুন্ডারা পালিয়ে যায়। শেখ মুজিব শহরের দক্ষিণ গোদারা ঘাট (বর্তমানে মোক্তারপাড়া ব্রীজ) দিয়ে শহরে প্রবেশ করেন।

সেবার জনসভাটি মোক্তারপাড়ার মাঠে অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। যথারীতি নেত্রকোণার ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ মঞ্চ তৈরিসহ যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন করে কিন্তু মুসলিম লীগের লেলিয়ে দেয়া গুন্ডাবাহিনী মঞ্চ ভাংচুর করে এবং শেখ মুজিবকে জনসভা করতে দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। এ রকম একটি জটিল পরিস্থিতিতে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন চকপাড়ার প্রভাবশালী খান পরিবারের যুবক আব্বাছ আলী খান। তিনি কয়েকজন যুবক বিশেষ করে- সর্বজনাব জালাল খাঁ, আব্দুল মজিদ (তারা মিয়া), ডা. জগদীশ দত্ত, আবুল হোসেন, সত্যকিরণ আদিত্য, ফুলে হুসেন, ফজলুর রহমান খান, আব্দুল খালেক, গাজী মোশারফ হোসেনসহ আরো কয়েকজন এসে বঙ্গবন্ধুকে সভার স্থান পরিবর্তনের অনুরোধ করেন এবং বঙ্গবন্ধুর সম্মতিতে এটি বারহাট্টা রোডে স্থানান্তরিত করেন।

সেদিনের অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন জনাব আব্দুর রহিম। সর্ব জনাব এন.আই. খান, ডাক্তার মিয়া হোসেন, মজির উদ্দিন মোক্তার প্রমূখ নেতারা জনসভায় উপস্থিত ছিলেন। এরই মধ্যে আব্বাছ আলী খান তাঁর নিজ বাড়িতে (চকপাড়ায়) বঙ্গবন্ধুসহ আগত সকল নেতাদের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। সভা শেষে বঙ্গবন্ধুকে খাবার গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি আব্বাছ আলী খানকে জিজ্ঞেস করেন তিনি আওয়ামী লীগ করেন কিনা? জনাব খান না সূচক জবাব দিলে বঙ্গবন্ধু খাবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। আব্বাছ খান বারবার অনুরোধ করতে থাকলে বঙ্গবন্ধু শর্তজুড়ে দেন যদি আব্বাছ খান এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগ এ যোগদেন তবে তিনি তার দাওয়াত রক্ষা করবেন। অতপর অনেকটা নিরূপায় হয়েই সদলবলে আব্বাছ আলী খান আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং আর কোনদিন মুসলিম লীগের গুন্ডারা আওয়ামী লীগের জনসভা ভাঙতে পারেনি। নেত্রকোণায় সূচিত হয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের। হাওড়ের উত্তাল ঢেওয়ে বঙ্গবন্ধুর নৌকা তরতরিয়ে চলতে থাকে। ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে মুসলিম লীগের।

বঙ্গবন্ধু দলকে শক্তিশালী করতে এরপর নেত্রকোণায় আসেন ১৯৫৬ সালে। অত্যন্ত গোপনে এসে মোক্তারপাড়ার ইনসান ভূইয়া সাহেবের বাড়িতে অল্প ক’জন নেতাকর্মী নিয়ে আলোচনা করে ঢাকায় ফিরে গেলেন। তারপর আসেন ১৯৫৭ সালে। ঢাকা থেকে সড়ক পথে নেত্রকোণা শহরের দক্ষিণ গোদারাঘাট (বর্তমানে মুক্তারপাড়া ব্রিজ) এসে নৌকায় মগড়া নদী পার হয়ে মোক্তারপাড়া মাঠের দক্ষিণ দিকে শিমুল গাছের তলায় আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা থেকে ট্রেনযোগে নেত্রকোণা কোর্ট স্টেশনে পৌঁছলে নেতাকর্মীরা তাঁকে সংবর্ধনা জানায় এবং মোক্তারপাড়ায় এন. আই. খান সাহেবের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম ও দুপুরের খাবার গ্রহণের পর মোক্তারপাড়ার মাঠে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন।

১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে গণঅভ্যুত্থানে মুক্তির পরই শেখ মুজিব হয়ে উঠলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, শেখ মুজিব থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধীতে ডাকসুর নেতা তোফায়েল আহমেদ এর নেতৃত্বে রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র-জনতার বাঁধভাঙ্গা জনসভায় বঙ্গবন্ধু উপাধীতে ভূষিত করা হয়। পাক জান্তা সরকারকে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে সারাদেশে জনমত গঠন ও স্বাধীকার আন্দোলনকে বেগবান করতে ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে তিনি নেত্রকোণায় আসেন। বঙ্গবন্ধুকে মহকুমা ছাত্রলীগ নেতা আশরাফ আলী খান খসরু, গোলাম এরশাদুর রহমান, হায়দার জাহান চৌধুরী, শামছোজ্জোহা, মতিয়র রহমান খান, আব্দুল ওয়াহেদ, আমি উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত, নজরুল ইসলাম খান, খন্দকার আনিস, রুহুল আমীন, নির্মল কুমার দাস প্রমূখ ছাত্রনেতার নেতৃত্বে শতশত ছাত্র এক বর্ণিল ও বিশাল সংবর্ধনা প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু মোক্তারপাড়া মাঠে বিশাল জনসভায় ভাষণ শেষে রাত্রি যাপন করেন মহকুমা প্রশাসকের ডাক বাংলোয়। সেখানেও গভীর রাত পর্যন্ত চলে নেতা-কর্মীদের সাথে মতবিনিময়। মহকুমা ছাত্রলীগের একজন সক্রিয়কর্মী হিসেবে আমি সেখানে উপস্থিত থাকার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম।
১৯৬৯ সালে আমার প্রথম বঙ্গবন্ধুকে দেখার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছিল। আমি ছোটবেলা থেকেই কঁচি কাচার মেলা করতাম। নেত্রকোণায় যার নাম ছিল মধুমাছি কঁচি কাচার মেলা । আমার বাবা ডা. জগদীশ দত্ত ছিলেন এর উপদেষ্টা ।  ১৯৬৩ সনের জানুয়ারি মাসে গঠিত মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার পরিচালক  ছিলেন -জনাব এডভোকেট একে ফজলুল কাদের  আর উপদেষ্টা মন্ডলীতে অন্যান্য যারা ছিলেন –  জনাব এন আই খান, আব্দুল খালেক, জনাব খালেকদাদ চৌধুরী,  এডভোকেট ফজলুর রহমান খান,মাওলানা ফজলুর রহমান খান,হাবিবুর রহমান খান  প্রমুখ। মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার প্রধান উদ্যেক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ছিলেন  কিংবদন্তী ছাত্র নেতা জনাব মেহের আলী । কঁচিকাচার মেলা থেকেই আমি শারীরিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রচমে পারদর্শী হয়ে উঠেছিলাম। ১৯৬৭ সালে নেত্রকোণা মহকুমা আর্টস কাউন্সিল ও ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহ জেলা আর্টস কাউন্সিল থেকে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে পুরস্কারও জিতেছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে কঁচিকাচার মেলার একটি চৌকস দল গার্ড অব ওনার দিয়েছিল। আমি(লখক) ছিলাম গার্ড দলের নেতা। এই প্রথম অবাক বিস্ময়ে দেখলাম এক দীর্ঘদেহী সৌম্যদর্শন পুরুষকে। আমার কাছে মনে হয়েছিল কোন এক স্বর্গ থেকে মর্তলোকে নেমে এলেন স্বয়ং দেবতা। দেবতুল্য সম্মোহনী কথায় তিনি সকল জনতাকে সম্মোহিত করেছিলেন সেদিন। তিনি আসলেন, জয় করলেন ও চলে গেলেন। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতে ভুবন বিখ্যাত বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ঠিকই বলেছেলেন- ‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবকে দেখেছি’।
 ১৯৭০ সালে নির্বাচনী প্রচারে হাওরাঞ্চলে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক লঞ্চ সফরের উদ্দ্যেশ্য ছিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের জনসমক্ষে পরিচয় করানো। সারা তালিকা চূড়ান্ত করার প্রায় দশদিন পর বঙ্গবন্ধু হাওরাঞ্চলে নির্বাচনী প্রচারণায় বেড়িয়ে পড়েন। ৫ অক্টোবর ১৯৭০ (১৮ আশ্বিন ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ) সোমবার দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘সপ্তাহব্যাপী সফরে আজ শেখ মুজিবের ঢাকা ত্যাগ’-শিরোনামে ছোট্ট করে হাওর যাত্রার খবরটি ছাপা হয়। অর্থাৎ ৪ অক্টোবর দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু হাওরাঞ্চলের নির্বাচনী সফরের উদ্দেশ্য ঢাকা ত্যাগ করেন।

৬ অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় বিস্তারিত সফরসূচি ছাপা হয়। খবরে বলা হয় ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও সিলেট জেলার পল্লী এলাকা সমূহে সপ্তাহব্যাপী সফরের উদ্দেশ্যে আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল (রবিবার) রাতে চট্টগ্রাম মেলযোগে ভৈরব রওনা হয়েছেন। গতকাল রাত ১ টায় ভৈরব পৌঁছার পর রাত্রি ২টায় লঞ্চযোগে তাঁর কুলিয়ারচর রওনা হওয়ার কথা। সপ্তাহব্যাপী এই সফরসূচির শেষদিন মোহনগঞ্জের জনসভা ছিলো সকাল ০৮ ঘটিকায় তাই ০৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় ধরমপাশার সভা শেষে বঙ্গবন্ধু ঐ দিনই চলে আসেন মোহনগঞ্জে।

পাথরঘাটায় লঞ্চ নোঙ্গর করা হয়। শেখ মুজিবকে এক নজর দেখার জন্য পাথরঘাটা হয়ে উঠে জনসমুদ্র। ১০ অক্টোবর, শনিবার সকাল ০৮ ঘটিকায় মোহনগঞ্জ জনসভা শেষে ট্রেন যোগে ময়মনসিংহ ফেরার পথে বারহাট্টা, ঠাকুরাকোনা, নেত্রকোণা ও শ্যামগঞ্জে সংবর্ধনা গ্রহণ করেন। নেত্রকোণা কোর্ট স্টেশনে অপেক্ষমান হাজার হাজার জনতার উদ্দেশ্যে ট্রেন থেকে নেমে ভাষণ দেন। এদিনও চকপাড়ার আব্বাছ আলী খান সাহেব বঙ্গবন্ধুর ও আগত নেতাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলেন। বঙ্গবন্ধু সব খাবার ট্রেনে তুলে শ্যামগঞ্জ নিয়ে যেতে বললেন এবং সেখানে সভা শেষ করে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে খাবার গ্রহণ করলেন। মহকুমা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সব নেতাই শ্যামগঞ্জ পর্যন্ত গিয়েছিলেন। সাথে ভলান্টিয়ার হিসেবে আমি ও নজরুল (বর্তমানে মেয়র)সহ অনেকেই গিয়েছিলাম।

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার জন্য জাতির জনক হিসেবে নেত্রকোণায় আগমন করেন। তাঁর আগমনকে ঘিরে নেত্রকোণা উৎসবের নগরীতে রূপ নিয়েছিল। সারা মহকুমা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের পদচারণায় শহর হয়ে গিয়েছিল জনতায় পরিপূর্ণ। রাস্তাঘাট, বাসা বাড়িতে তিল ধারনের ঠাঁই নেই। কলেজ মাঠে ছিল জনসভা। জনসভাকে কেন্দ্র করে মাঠ ভরে কলেজের চালে পর্যন্ত মানুষ উঠে জনাকীর্ণ অবস্থা তৈরি করে। তিনি ডাকবাংলো থেকে গাড়ি বহর নিয়ে খুব ধীরে ধীরে সভা মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন আর হাত নেড়ে রাস্তার পাশে দন্ডায়মান জনতাকে অভিনন্দন জানাতে জানাতে এগিয়ে চলেছেন। কলেজ মাঠ থেকে জাতির পিতার আগমনী বার্তা প্রচার হচ্ছিল আর লাখো জনতার কন্ঠে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ¯স্লোগানে ¯ স্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। এত মানুষ এর আগে আর কোন জনসভায় হাজির হয়নি। নেত্রকোণার ইতিহাসে স্মরণীয় এ সভাটিতে একটি ট্রাজেডিও তৈরি হয়েছিল, জনতার ভার সইতে না পেরে কলেজের টিনের চাল ভেঙ্গে পড়ে এবং কয়েকজন হতাহত হয়। বঙ্গবন্ধু প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সবাইকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সৎকার করতে। নানাবিধ কর্মসূচি দিয়ে সাজানো ছিল সফরটি। পথিমধ্যে তিনি সাতপাইয়ে সদ্য প্রতিষ্ঠিত নেত্রকোণা উচ্চ বিদ্যালয়টির শুভ উদ্বোধন করেন।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, চেতনার বিস্তার ও একটি স্বতন্ত্র জাতির স্বপ্ন তো বঙ্গবন্ধু ছাত্র জীবন থেকেই দেখতেন। তিনি তাঁর চেতনাকে শাণিত করেছেন ধাপে ধাপে নানাবিধ বাধাকে অতিম করে। তিনি যৌবনে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে এসে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন জাতিকে নেতৃত্ব দিতে, মাতৃভ‚মিকে শৃঙ্খল মুক্তির ইস্পাত-কঠিন সিদ্ধান্তটি যে জীবনের শুরুতেই নিয়েছিলেন। আর তিনি তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন বাঙালি জাতিকে দমিয়ে রাখা যায় না। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি আর বলয় পৃথিবীর যে কোন জাতিগোষ্ঠী থেকে একেবারেই আলাদা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্নেহ, ভালবাসা, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামানের মতো মহান নেতাদের ভালবাসা ও অকুন্ঠ সমর্থন, সাথে পথচলা তাঁকে দিয়েছিল বিশাল প্রেরণা। বাংলার জনগণের ভালবাসা তাঁকে করেছিল হিমালয় সমান উঁচু ও দৃঢ়। যা পাকিস্তান ও তাদের মিত্র চীন, আমেরিকাসহ মুসলিম দেশগুলোও টলাতে পারেনি।

তিনি প্রতিষ্ঠা করে ছাড়লেন তাঁর স্বপ্নের স্বদেশ, বাংলাদেশকে। বঙ্গবন্ধুকে ঘরে বাইরে শত্রুর মোকাবেলা করতে হয়েছিল। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ও তিন লক্ষাধিক মা বোনের ইজ্জত দিয়ে এ স্বাধীনতাকে আনতে হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ডাক এতই শক্তিশালী ছিল যে যদি আরো দীর্ঘ সময় লড়াই করে যেতে হতো ও আরো প্রাণ বিসর্জনের প্রয়োজন হতো তবুও বাঙালি রণে ভঙ্গ দিতো না। এত হত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষণ, নির্যাতনের পরও মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবলে চির ধরাতে না পেরে শেষের দিকে পাক বাহিনীই মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। জয় বাংলা স্লোগানে তাদের মনোবলে ফাটল ধরিয়ে দিত।

পাক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে ইতিহাসে বর্বর, জঘন্য হত্যাকান্ডের সূচনা করে ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালের রাতের আঁধারে। ইপিআর হেডকোয়ার্টার পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পুরাতন ঢাকার শাঁখারি বাজারসহ অসংখ্য জায়গায় রাতের আঁধারে ওরা নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালিকে হত্যায় মেতে উঠে। তাদের লক্ষ্য ছিল রাতের আঁধারে যদি লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করা হয় তবে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু ভয় পেয়ে আপসের রাস্তা খুঁজবেন। কিন্তু ওদের ধারণা ভুল ছিল। মহান নেতা ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতিকে প্রতিরোধের বার্তা দিয়েছিলেন। তারপরও ঢাকা আক্রান্ত হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। ২৫ মার্চ (ক্যালেন্ডারের হিসাবে ২৬ শে মার্চ ১৯৭১, প্রথম প্রহর) গভীর রাতে তিনি মহান স্বাধীনতা ঘোষণা প্রদান করেন তৎকালীন ইপিআরের সুবেদার মেজর শওকত আলীর ওয়ারলেস ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে। বার্তাটি চট্টগ্রামসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকেও শোনা গিয়েছিল। পরদিন ২৬ মার্চ ও ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানসহ আরো কয়েকজন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে পাঠ করেন। বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই পাক সেনাদের হাতে বন্দি হন।

আমার বাবা ডা. জগদীশ দত্ত ১৯৩৮ সাল থেকেই স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ব্রিটিশদের এদেশ থেকে চিরতরে বিতাড়নের জন্য মাঠে কার্যকর ছিলেন। নিষ্ঠা আর সততায় তিনি নেতাজী সুভাষ বোসের আজাদ হিন্দ ফোর্সের নেত্রকোণা অঞ্চলের ‘হোমগার্ড ক্যাপ্টেন’ হয়ে যান ১৯৪০ সালেই। নেতাজীর নেত্রকোণা আগমনে যে কয়জন তরুণ ভলান্টিয়ার ক্যারিশম্যাটিক কাজ প্রদর্শন করেছিলেন তার মধ্যে ডা. জগদীশ দত্ত অন্যতম। ১৯৪৫ সালে সারা ভারত কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় নেত্রকোণায় নাগড়ার মাঠে। এখানেও আমার বাবার ব্যাপক সহযোগিতা ছিল। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল তা বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে শেষ হয়।

আর প্রতিটি ধাপেই ছিল আমার বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ। ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত নেত্রকোণায় একজন নিবেদিত প্রাণ সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ছাপিয়ে নাট্যকার ডা. জগদীশ বাবুকেই নেত্রকোণাবাসী এখনও উজ্জ্বলভাবেই মনে রেখেছে। অথচ তিনি মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করেন। তিনি একজন ভাষা সংগ্রামী ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে মহকুমা আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি যোগদেন। ২৭ মার্চ নেত্রকোণা আওয়ামী লীগ অফিসে নেত্রকোণার তৎকালীন মহকুমা আওয়ামীলীগ এর নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। নেত্রকোণা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও আটপাড়া মদন খালিয়াজুরী এলাকার এম.পি আব্দুল খালেক সাহেবকে আহবায়ক করে নেত্রকোণা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সকল নির্বাচিত এম.এন.এ তথা জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দুল মমিন, মোঃ জুবেদ আলী, সাদির উদ্দিন আহমেদ ও এম.পিগণ তথা প্রাদেষিক পরিষদ সদস্য আব্বাছ আলী খান,ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ,আব্দুল মজিদ তারা মিয়া, মোঃ হাদীস উদ্দীন চৌঃ, মোঃ নাজমুল হুদা সংগ্রাম পরিষদে অন্তর্ভূক্ত হন।তাছাড়া নেত্রকোণা পৌর চেয়ারম্যান এন আই খান,এডভোকেট ফজলুর রহমান খান,খালেকদাদ চৌধুরী,এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের, মোঃ মেহের আলী,মৌলানা ফজলুর রহমান খান, নুরু মিয়া,জামাল উদ্দিন আহমেদ, সাফায়েত আহম্মদ খান,মোঃ শামছুজ্জোহা, গোলজার হোসেন,গোলাম এরশাদুর রহমান, হায়দার জাহান চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হয় মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ ।

আমি আমার বাবার কাছ থেকেই অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ শুনেশুনে বড় হয়েছি। মানস পটে রচিত হয়েছিল স্বাধীকার আন্দোলনে অংশগ্রহণের এক প্রবল বাসনা। যার ফলে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে নেত্রকোণার রাজপথে হেঁটেছি, মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি জীবনের মায়া ত্যাগ করে। ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে মহকুমা প্রচার টিমে যুক্ত হয়েছি বাবার সাথে। আমার বোন মমতা দত্ত ও নমিতা দত্ত নৌকার পক্ষে ভোট প্রার্থণা করে গ্রামে-গঞ্জে সাংস্কৃতিক টিম নিয়ে গিয়ে গান পরিবেশন করে জনমত গঠন করেছে। নেত্রকোণায় ছাত্ররাজনীতির হাতেখড়ি ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। দেশকে শত্রুমুক্ত করে দেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পতাকা উড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে আমরা নেমে পড়লাম যুদ্ধের ময়দানে।

৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে নিহিত ছিল স্বাধীনতার বার্তা। বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন- আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।

২৩ মার্চ ১৯৭১ নেত্রকোণায় পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়েছিল। তৎকালীন নেত্রকোণা পৌরসভার চেয়ারম্যান জনাব এন আই খান বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে ছাত্র-জনতার সালাম গ্রহণ করেন। গোলাম এরশাদুর রহমান ও হায়দার জাহান চৌধুরীর নেতৃত্বে শতশত ছাত্র মার্চপাস্টে অংশগ্রহণ করে। আমিও(লখক) ছিলাম সে ঐতিহাসিক কর্মযজ্ঞে। সর্ব জনাব গোলাম এরশাদ, হায়দার জাহান চৌধুরী, শামছুজ্জোহা, শাফায়াত আহমেদ, খন্দকার আনিস, নজরুল ইসলাম খান ও আমিসহ অনেকেই দলবদ্ধভাবে যেয়ে মহকুমা প্রশাসককে হ্যান্ডস আপ করিয়ে অস্ত্রাগার থেকে সকল অস্ত্র নিয়ে আসি। যা দিয়েই মোক্তারপাড়া মাঠে আমাদের সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। তখনকার মহকুমা পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) আমাদের প্রশিক্ষণ করাতেন।

এপ্রিলের শুরুতে ময়মনসিংহ শহরের পতন হলে আমরা সপরিবারে চলে যাই নেত্রকোণা শহর ছেড়ে খালিয়াজুরির খলা গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে, যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি নিতে। এ গ্রামটি মোহনগঞ্জের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য জনাব আখলাকুল হোসাইন আহমেদ এঁর নিজ গ্রাম হাটনাইয়ার ঠিক উল্টো দিকে নদীর এপাড় আর ওপাড়। ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ হাটনাইয়ার গ্রামের বাড়ি থেকেই অনেক ছাত্রনেতা-জনতাকে রিক্রট করে ভারতের মেঘালয়ের মহেষখলা ক্যাম্পে পাঠাতেন এবং তিনি নিজেও মহেষখলা ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালকের দায়িত্বগ্রহণ করেন। পরে তিনি এ ক্যাম্পের ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত। আমার বাবা ডা. জগদীশ দত্তও এই মহেষখলা ক্যাম্পের একজন পরিচালক ছিলেন। ১১ সদস্য বিশিষ্ট মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত  অন্যান্য সদস্য যারা ছিলেন – মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব নেত্রকোণার ১. ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ(সভাপতি-জুন – ডিসেম্বর), ২. সুনামগন্জের(ধর্মপাশা) আব্দুল হেকিম চৌধুরী(সভাপতি-এপ্রিল – জুন),৩. এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের(নেত্রকোণা), ৪. বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী, ৫. মোঃ মেহের আলী ( নেত্রকোণা সদর), ৬. ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত,(নেত্রকোণা সদর),৭. জনাব আব্দুল কুদ্দুস আজাদ(মোহনগঞ্জ), ৮. জনাব নুরুজ্জামান চিশতী(বারহাট্টা),৯. জনাব মারাজ মিয়া চেয়ারম্যান,১০. জনাব ইনসান উদ্দিন খান(বারহাট্টা),  ১১. আব্দুল বারী তলুকদার(নেত্রকোণা সদর) । পরবর্তীতে জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী টেকেরঘাট ক্যাম্পে চলে যান । উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল মমিন -এমপি, নেত্রকোনার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক এমপি, কিশোরগঞ্জের এমপি আব্দুল কাদের, নেত্রকোনার হাদিছ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মহেষখলা হয়ে ইন্ডিয়া চলে যান এবং কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে মু্ক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দায়িত্ত্ব পালন করতে থাকেন। ভারতীয় বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন চৌহান মাঝে মাঝে মহিষখলা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতেন। মহিষখলা ফরেস্ট অফিসের নিকট স্থাপন করা হয় মুজিব বাহিনী ক্যাম্প। সর্বজনাব গোলাম এরশাদুর রহমান ও হায়দার জাহান চৌধুরী ছিলেন মুজিব বাহিনী নেত্রকোণা জোনের কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার। আর তোরার নিকটস্থ খেরাপাড়া ছিল মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর। খেরাপাড়াতে ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ জোয়ারদার বাবুল নেত্রকোণার পক্ষে কর্মরত ছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ,শেরপুর,জামালপুর ও টাঙ্গাইল নিয়ে গঠিত অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিনায়ক। মুজিব বাহিনীর মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সর্বজনাব রুহুল আমীন  (নেত্রকোণা সরকারী কলেজের বর্তমান সিনিয়র প্রভাষক), মোহনগঞ্জের প্রাক্তন জাসদ নেতা গোলাম রব্বানী চৌধুরী, এ,কে,এম আশ্রাব আলী (আবুল কুরেশ) ও সচিব উজ্জ্বল কুমার দত্ত। কিছুদিনের জন্য শিবগঞ্জ রোডের স্বনামধন্য কৌতুকাভিনেতা সিরাজ উদ্দিন, মতিয়র রহমান তালুকদার ও মোস্তাফিজুর রহমান রেজভী ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। এখানেই এই ক্যাম্পে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরকে রিক্রুট করে উন্নত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য সিনিয়রদেরকে দেরাদুন এর তান্ডুয়া আর জুনিয়রদের আসামের হাফলং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুজিব বহিনীর প্রশিক্ষণ মুক্তিবাহিনী অপেক্ষা ভিন্নতর ছিল। মুজিব বাহিনী পরিচালনার জন্য সকল ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হতো তৃণমূলের কমান্ড স্ট্রাকচার। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব মুজিব বাহিনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়। মুজিব বাহিনী ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের জয়লাভের পরিকল্পনার ফসল।  

একেবারে শুরুর দিকে এরশাদ ভাই ও হায়দার ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা মহেশখলা ক্যাম্পটি গড়ে তুলি। আমরা ৪ জন, এরশাদ ভাই, হায়দার ভাই, সুলতান নুরী ও আমি একটি টিনশেড ঘরে ক্যাম্প স্থাপন করে কাজ শুরু করি। প্রায় প্রতিদিনই এর সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। বন্ধুদের মধ্যে খন্দকার আনিস, রুহুল আমিন, মনজুর উল হকও মহেষখলা ক্যাম্পে যোগদেয়। নজরুল (নেত্রকোণা পৌরসভার মেয়র) তার পিতা, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, রংরা ক্যাম্প ইনচার্জ জনাব আব্বাছ আলী খান সাহেবের সাথে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে বিএলএফে যোগদেয়। সে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে গোয়েন্দা শাখায় যোগদান করে।

তার প্রধান কাজ ছিল এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে গুরুত্বপূর্ণ ও অতিগোপনীয় সংবাদ আদান প্রদান করা। ফলে প্রায়ই সে বাঘমারা থেকে মহেষখলা ক্যাম্পে আসতো। প্রাথমিক প্রশিক্ষণে আমরা স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করি। একপর্যায়ে মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সেক্রেটারি হওয়ার সুবাধে এরশাদ ভাই ও হায়দার ভাইকে পাঠিয়ে দেয়া হয় দেরাদুন ভারতীয় আর্মির প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। তাঁরা যাবার সময়ে আমাকে ক্যাম্পের কোয়ার্টার মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব অর্পন করে যান।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহান এ নিয়োগ অনুমোদন দেবার সাথে সাথেই বিশাল এক দায়িত্ব এসে পড়ে আমার কাঁধে। অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাবার, বেতন-ভাতার টাকা, পোষাক পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে যাবতীয় রসদ, ভান্ডারের বিপুল বোঝা মাথায় নিয়ে কাজ করতে শুরু করি। এ দায়িত্ব যাতে সুষ্ঠুভাবে পালন করতে পারি তার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা করা হয়। এক সাহা পরিবারের কাছ থেকে বিশাল আকৃতির একটি লোহার সিন্দুক কেনা হয় অস্ত্র ও টাকাপয়সা সুরক্ষিত রাখার জন্য। সিন্দুকটি মাটির নীচে স্থাপন করা হয় ও এর ঢাকনাটি মাটির সমান করে রাখা হয়েছিল যাতে এটি সহজে খোলা যায়, আবার কেউ চটকরে বুঝতেও পারবেনা এখানে মাটির নীচে অস্ত্র-অর্থ আছে। এটি সুরক্ষিত বাংকার এর মতো কাজ করতো। আমি গভীর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি প্রয়াত এরশাদ ভাই ও হায়দার ভাইয়ের প্রতি। তাঁদের জন্যই আমি মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করতে পেরেছিলাম। কোয়ার্টার মাস্টারের দায়িত্বের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে সীমান্ত এলাকায় অপারেশনেও যেতে হতো। সীমান্তের কাছে চলে আসা পাকিস্তানী আর্মিদের হাত থেকে ক্যাম্পকে ও ক্যাম্পে আগত শরণার্থীদের আগমন নিরাপদ রাখবার জন্য অপারেশন চালানো হতো।

ক্যাম্প গঠনের প্রথম দিকে সীমান্ত জুরে একটা দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়ে তুলেছিল আটপাড়ার সেকান্দর নূরী। কিন্তু পরবর্তীতে  যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সেকান্দর নূরী বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা,নির্যাতন,লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। বিশেষ করে ষাটের দশকে নেত্রকোণার রাজনীতির কিংবদন্তী পুরষ আওয়ামীলীগের অত্যন্ত সৎ ও নির্ভীক জননেতা শহীদ মেহের আলীকে হত্যা  এবং কোম্পানী কমান্ডার  শামছুজ্জোহা ও আমীর উদ্দীন আহমেদকে হত্যার উদ্দ্যেশে আটকের ফলে মহেষখলা ক্যাম্পের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। আমার বাবা ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত মহেষখলা ক্যাম্পের অন্যান্য পরিচালকদের নিয়ে বিচক্ষণতার সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনেন। যার বর্ণনা দেশের জাতীয় ব্যক্তিত্বদের লেখায় বর্ণিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা ও সংরক্ষণ করছে ইউনেস্কো। তিনি শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। সারাজীবন নিপীড়িতের স্পন্দনরোল থামাবার জন্য লড়ে গেছেন। লড়েছেন সামাজিক সাম্য আর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। নিজের দলের লোকদের অন্যায়কেও তিনি ছেড়ে বলেননি। তার কাছে কৃষক-মজুর, নেতা-কর্মী, চাকরিজীবী-বেকার সবাই সমান। সকলের কাছে তিনি মুজিব ভাই, নিজ এলাকায় ভাইজান। তিনি নিজেই বলেছেন-আমি সকলের ভাইজান। পিতা ও ছেলে সবাই আমাকে ভাইজান বলেই ডাকে। তিনি সবাইকে ভালোবাসতেন নিজের জীবনের চেয়েও বেশী। সবার জন্য তাঁর দ্বার উন্মুক্ত ছিল। ধানমন্ডির বাড়িটি ছিল জনগণের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। সরকার প্রধান হয়েও তিনি নিরাপত্তার বিষয়টি আমলে আনেননি।

পাকিস্তানি কারাগার থেকে ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ মুক্তি পেয়ে লন্ডন-দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি নিজ ভূমে ফিরে আসেন। বিমান বন্দরে লাখো লাখো জনতার গগণ বিদারী স্লোগানের মধ্যেই নিজ মাটিতে পা রাখেন। অশ্রু সজল চোখে সবার কুশল জানতে চান। তিনি সবাইকে নিয়ে দেশ গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন খুব দ্রুত সময়ে। কোন বিশ্রাম নেই, কোন ক্লান্তি নেই, কোন নিদ্রা নেই, সব ত্যাগ করে তিনি লেগে গেলেন দেশকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে। কোষাগার শূন্য, দেশের সব ভাঙ্গা, পোড়ানো। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র জমা দিয়ে দেশ গঠনের কাজে লেগে যেতে আহবান করলেন। সব চেয়ে সুহৃদ, অকৃত্রিম বন্ধু শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধীকে তার সৈন্য ফেরত নিতে অনুরোধ করলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠালেন যা ইতিহাস। এর আগে পৃথিবীর কোথাও মিত্রবাহিনীর সৈনিকদের এত তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে হয়নি। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র গ্রহণের তারিখ ঘোষণা করলেন।

বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেই পূনর্গঠনে মনোনিবেশ করেছিলেন। একটি শাসনতন্ত্র তৈরির জন্য গণপরিষদ গঠন করলেন। এখানেও ইতিহাস রচিত হলো। খুব অল্পসময়ে একটি চমৎকার লিখিত সংবিধান জাতির জন্য রচিত হলো। গণপরিষদে ১৯৭২ সালে তা গৃহীত হবার পর পরই সাংবিধানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে দেশে সুশাসনের দিকে মনোনিবেশ করলেন। পৃথিবীর সকল প্রেরণাদায়ী নেতা ও মানুষকে তিনি সম্মান করতেন। বঙ্গবন্ধু গুণীর কদর করতে জানতেন । পৃথিবীর সব বিপ্লব, শোষণ, নিপীড়ণের বন্ধে কথা বলতেন। বঙ্গবন্ধু ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’, নীতিতে বিশ্বাস করতেন এবং সেই মোতাবেক পররাষ্ট্র নীতির প্রচলন করেন। যেদেশ ও ভাষার জন্য তিনি লড়াই করেছেন তার মর্যাদা রক্ষায় সারাজীবনই কাজ করেছেন। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান যিনি নিজ মাতৃভাষা বাংলায় জাতিসংঘের সাধারণ সভায় বক্তৃতা করেছিলেন। বাংলা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদায় আসীন।

দেশ হল। জাতির পিতা এসে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। সবাইকে সাথে নিয়ে দেশ গঠনে নিরলস কাজও করে যাচ্ছেন। কিন্তু পরাজিত শক্তির দোসররা এটা মেনে নিতে পারেনি। সবার অলক্ষে জাতির পিতাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। বাঙালি মেতে আছে নানাবিধ কাজে আর ঘাতকরা মওকা খুঁজছে কখন তাঁদের ঘৃণিত ও কুৎসিত রূপটিকে প্রকাশ করবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সে নির্মম দিনটি জাতির জীবনে নেমে আসে। বর্বর পাক হানাদারদের দোসররা জাতির ললাটে কলঙ্ক লিপ্ত করে জাতির জনককে হত্যা করে। সমগ্র জাতি হতবাক হয়ে যায়।

বিশ্ববাসী বাঙালিকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এটা কোন বাঙালি জাতি? যে জাতি তার পিতাকেই হত্যা করেছে! এরা বর্বর, বেঈমান, বিশাসযোগ্যতা নেই এদের। আমরা সত্যি বিশ্ববাসীর কাছে জাতি হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে ও খুনিদেরকে বিচারের মুখোমুখি না করার আইন করে। জাতির জীবনে তখন ঘোর অমানিশা। জাতির পিতার খুনি ফারুক রশীদ, ডালিম চক্রান্তের ক্রীড়ানক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবর দখলকারী (Useqer) মোশতাক চক্র তখন দন্ড মুন্ডের হর্তাকর্তা বিধাতা। রক্ত পিপাসু ড্রাকুলা (dracula) সরকার তখন সমগ্র বাংলাদেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব (reign of terror) কায়েম করে। স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের উপর নেমে আসে নির্যাতনের স্টিমরোলার। হত্যা, গুম, খুন, নির্যাতন তখন রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ।

চারদিকে বিভীষিকা-আতঙ্ক। এই বৈরী পরিবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, মুজিব ভক্ত মানুষ গোপনে গোপনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সংগঠিত হতে থাকে। এই পর্বে নেতৃত্ব দেন সৈয়দ আহমেদ, এস এম ইউসুফ, শফিকুল আজিজ মুকুল, রাশেদ মোশাররফ, সৈয়দ রেজাউর রহমান মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ। আর এই প্রতিরোধ যুদ্ধে জগন্নাথ হল দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে পরিণত হয়। জগন্নাথ হল ভিত্তিক গোপন সাংগঠনিক তৎপরতায় নেতৃত্ব দেন হরে কৃষ্ণ দেবনাথ, চন্দন চৌধুরী, দীপঙ্কর তালুকদার, প্রকৃতি মল্লিক, মুকুল বোস, দ্বিজু খান, উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত প্রমুখ। সমন্বয়কের দায়িত্বে জনাব ইসমত কাদির গামা, ওবায়দুল কাদের, বাহালুল মজনুন চুন্নু প্রমুখ ছাত্রনেতা। গোপন-প্রকাশ্য সাংগঠনিক তৎপরতায় সিদ্ধান্ত হয় ৪ঠা নভেম্বর বটতলায় ফ্যাসিস্ট সামরিক শাসন ও খুনী মোশতাক-জিয়ার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতার ব্যাপক সমাবেশ ঘটিয়ে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করা হবে। খুনীদের উৎখাত করা হবে।

ইতিমধ্যে ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ (বীরউত্তম) নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারগণ সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠার রক্ষ্যে সেনাঅভ্যুত্থান ঘটায়। খুনীদের দোসর অবৈধ সেনাপ্রধান জিয়াকে গৃহবন্দী করা হয়। এ ঘটনায় দৃশ্যত মুক্তিকামী জনগণ উজ্জীবিত হয়। ৪ নভেম্বর সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে মুক্তিকামী ছাত্রজনতা দলে দলে জমায়েত হতে থাকে। সকাল ১০টার মধ্যে কলাভবনের বটতলায় ছাত্র জনতার প্লাবন নামে। খুনী-ফ্যাসিস্ট শাসনের বিচারের দাবীতে লাখো জনতা শ্লোগানে গর্জে ওঠে। শুরু হয় বিক্ষোভ মিছিল। লক্ষ্য জাতির পিতার বাসভবন- ধানমন্ডির ৩২ নম্বর। জগন্নাথ হল থেকে হরে কৃষ্ণ দেবনাথ, দীপঙ্কর তালুকদার, চন্দন চৌধুরী, মুকুল বোস, উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত, দ্বিজু খানের নেতৃত্বে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল কলাভবনের উত্তাল সমাবেশে সামিল হয়ে বঙ্গবন্ধু ভবন অভিমুখে অভিযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। ছাত্র-জনতার বিশাল গণমিছিল রাজপথ প্রকম্পিত করে ৩২- নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে পৌঁছায়। ছাত্র-জনতা ‘হায় পিতা, হায় পিতা’ ‘হায় মুজিব, হায় মুজিব’ আর্তিতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। অনেকেই রাস্তায় গড়াগড়ি দেয়। বাঙালির রূদ্ধ প্রাণের আবেগ বাঁধভাঙ্গা জোয়ারে রূপ নেয়।

সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। এরপর সমবেত ছাত্র-জনতা ‘শোককে শক্তিতে পরিণত করে’ খুনীদের এবং তাদের দোসর মোশতাক চক্রকে উৎখাত করার শপথ নিয়ে গণমিছিলের সমাপ্তি করে। মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন খালেদ মোশাররফ (বীরউত্তম)-এর মাতা, ভাই রাশেদ মোশাররফ, সৈয়দ আহমদ, বেগম আইভি রহমান, ইসমত কাদির গামা, শফিকুল আজিজ মুকুল, বাহালুল মজনুন চুন্নু, এস এম ইউসুফ, মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ। প্রকৃতপক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় লাখো ছাত্র-জনতার স্বত:স্ফূর্ত গণজমায়েত ও বিক্ষোভ মিছিলটিই ছিল ৭৫-উত্তর খুনী ফারুক-রশীদ এবং ফ্যাসিস্ট মোশতাক চক্রের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রথম গণঅভ্যুত্থান।

ইতোমধ্যে আবার শুরু হয় শাঠ্য-ষড়যন্ত্রের নোংরা খেলা। পাকিস্তানী দালাল সাংবাদিক আতিকুল আলম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির উত্থানের আঁচ পেয়ে নভেম্বরের গোড়ার দিকে রয়টার এবং বিবিসির বাংলায় এক সাক্ষাৎকারে গুজব রটিয়ে দেয়- জেলখানায় বন্দী শহিদ তাজউদ্দীনের সাথে ভারতের ইন্দিরা সরকারের গোপন যোগাযোগের কল্পিত ভুয়া সংবাদ। গুজব ছড়িয়ে জনমনে রটিয়ে দেয় যে ভারতীয় সেনাবাহিনী কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম থেকে যে কোনো মুহূর্তে ঢাকা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। এভাবে গুজব রটিয়ে ভারতবিদ্বেষী মনোভাব চাঙ্গা করা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের বৈরী শক্তিকে সংঘবদ্ধ করা হয়।

এই পর্যায়ে ষড়যন্ত্রের কুশীলব মোস্তাক, জিয়া, কর্ণেল তাহের এদের মধ্যে অশুভ আঁতাত তৈরি হয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় কূচক্রীদের নেতৃত্বে ৬ই নভেম্বর রাত ১২টার পর তথাকথিত সিপাহী জনতার বিদ্রোহের নামে মুক্তিযোদ্ধা হত্যার তান্ডব শুরু হয়। শহীদ মিনার, জগন্নাথ হল এলাকায় ট্রাকে ট্রাকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাদের একাংশ থেকে শ্লোগান তোলা হয়, ‘কমরেড জিয়া, জেনারেল জিয়া, লাল সালাম, লাল সালাম। রুশ-ভারতের দালালদের হত্যা কর, জবাই কর, একটা দুইটা মালাউন ধর, সকাল বিকাল নাস্তা কর। ‘সিপাহী ভাই সিপাহী ভাই, সুবেদারের উপর অফিসার নাই’। ‘সিপাহী ভাই সিপাহী ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’। ‘জিয়া ভাই-মোশতাক ভাই, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। সারা শহর সেদিন ট্যাংকের দখলে। অস্ত্রাগার ভেঙ্গে সশস্ত্র সেনারা দলে দলে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বেরিয়ে পড়ে। তাদের প্রচন্ড গোলাগুলি বর্ষণে ঢাকা শহর রণাঙ্গনে রূপ নেয়।

শহরজুড়ে ভীতি, আতঙ্ক, বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়ে। সে এক বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা ও নৈরাজ্যের পরিস্থিতি ভাষায় বর্ণনা করা প্রায় দুঃসাধ্য। সেনাদের পাকিস্তানপন্থী একাংশ পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগানও দিচ্ছিল। চারদিকে প্রচন্ড গোলাগুলি, ট্রেসার বুলেটে ভোরের আকাশ লাল হয়ে উঠছিল। চারদিকে বিভীষিকা, আতঙ্ক ও নৈরাজ্য। শহর জুড়ে হত্যা, রক্তের হোলি খেলার তাÐব বয়ে যাচ্ছিল। ৭ই নভেম্বর প্রত্যূষে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের অকুতোভয় সেনানায়ক, পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে যার শৌর্য্য ও রণকৌশল কিংবদন্তীতুল্য, আমাদের জাতীয় বীর জেনারেল খালেদ মোশাররফ (বীরউত্তম), কর্নেল হায়দার (বীরউত্তম), কর্নেল হুদাসহ অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে উন্মত্ত সিপাহীরা নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। এ দিন অন্যদের সাথে আমাদের নেত্রকোণার গর্ব অত্যন্ত চৌকস, মেধাবী ও তরুণ আর্মি অফিসার বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আনোয়ারকেও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। জাতির জীবনে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় নেমে আসে যা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এভাবেই প্রতি বিপ্লবীরা আবার সাময়িকভাবে ক্ষমতায় জেঁকে বসে।

সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে ৭ নভেম্বর প্রত্যুষে হরে কৃষ্ণ দেবনাথ, আমিসহ আরো কিছু ছাত্রনেতা-কর্মী গোপনে লিফলেট বিলি করতে থাকলে গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে যাই। গোয়েন্দা টিম আমাদের চ্যালেঞ্জ করে ও গ্রেফতারের চেষ্টা চালায়। এ অবস্থায়ও ছাত্রনেতারা খুনি মোস্তাক-জিয়ার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে দৌঁড়ে পালাতে চেষ্টা করতে থাকেন। এক পর্যায়ে পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। এদের নিক্ষিপ্ত একটা গুলি আমার পায়ে লাগে। গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায়ই দৌড়ে অন্য গলিতে ঢুকে গ্রেফতার এড়িয়ে রাস্তায় পড়ে যাই। এ সময় রাস্তায় টহলরত সামরিক বাহিনীর একটি টিম প্রায় অচেতন অবস্থায় আমাকে গাড়িতে তুলে নেয়। আর্মিরা এ সময়ে আমার কাছে কোনো কিছু পায়নি, লিফলেটগুলো দৌড়াবার সময়ই ফেলে দিয়েছিলাম। আমি অস্পষ্টভাবে আর্মিদের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম। ওরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল যেহেতু গুরুতর আহত ব্যক্তির কাছে সরকার বিরোধী কিছু পাওয়া যায়নি সেহেতু তাকে আটক করবার প্রয়োজন নেই। যেভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তাতে ওর চিকিৎসা না হলে মারা যাবে।

সামরিক বাহিনীর এ টিমকে ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনে হচ্ছিল। আর্মিতে তখনও বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দেশপ্রেমিক কিছু সদস্য যে ছিলনা তা নয়। প্রায় অচেতন অবস্থায় আমাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য রেখে যায়। ঢাকা মেডিকেলে আমার চিকিৎসা চলে কিন্তু গ্রেফতার এড়াতে একটু সুস্থ হতেই সেখান থেকে আমি পালিয়ে যাই। ৩ নভেম্বর ঘাতক দল জেলে হত্যা করে জাতীয় চার নেতাকে। ৭ নভেম্বর চলে রক্তের হোলি খেলা, অভ্যুত্থান পাল্টা অভ্যুত্থান। এতে জাতির মুক্তিতো আসেইনি বরং ফ্যাসিস্ট জিয়ার ক্ষমতা পাকাপোক্ত ও নিরঙ্কুশ হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে নানা ঘটনায় শাঠ্য-ষড়যন্ত্রে সামরিক একনায়ক ফ্যাসিস্ট জিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। আইএসআই-এর মদদে প্রতিষ্ঠিত হয় শিখন্ডি ড্রাকুলা সরকার। রাষ্ট্রীয় মদতে যুদ্ধাপরাধী, দালাল, স্বাধীনতাবিরোধীদের সংগঠিত করা হয়। গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে আলবদর, আলশামস, রাজাকার, খুনীরা দখল করে নেয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

আয়োজন করা হয় বিভিন্ন কিসিমের ‘জলসার। আওয়াজ তোলা হয় ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি জাতীয় সঙ্গীত পাল্টানোর। জলসায় শ্লোগান উঠে ‘জিয়া ভাইÑ তোয়াব ভাই চাঁন তারা পতাকা চাই’।

রাষ্ট্রীয় নীতি থেকে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, জয়বাংলা, ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা, উদারবাদ, মানবিকতা নির্বাসন দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর নাম তখন নিষিদ্ধ। মধ্যযুগীয়, বর্বর, ধর্মান্ধ এক অন্ধকারের রাজত্ব সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো জাতির বুকে চেপে বসে। রাজপথের সাথীদের একাংশ তখন ফ্যাসিস্ট জিয়ার অসাংবিধানিক শাসনকে বৈধতা দেয়ার জন্য ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে শামিল হয়। তথাকথিত ‘খালকাটার বিপ্লব’-কে দেশগড়ার কর্মসূচি বলে গ্লোরিফাই(Glorify) করা হয়। ফ্যাসিস্ট জিয়াকে সমর্থনের নামে হাজির করা হয় বিভিন্ন তত্ত¡ ও থিউরি। জাতীয় জীবনে তখন ঘোর বিভ্রান্তি। মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষের রাজনীতি তখন নিষিদ্ধ। ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করা হয় জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক। সারা ঢাকায় পাতাবাহার উর্দিপরা গেস্টাপো বাহিনীর তখন দর্পিত পদচারণা। চারিদিকে আতঙ্ক বিভীষিকা সন্ত্রাস। সে এক বীভৎসকাল।

ফ্যাসিস্ট সামরিক একনায়ক জিয়ার দুঃশাসনামলে ৭৬-এর শেষ কিংবা ৭৭-এর গোড়ার দিকে যখন বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রের নীলনকশা চূড়ান্ত সেই বৈরী পরিবেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জাতীয় নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে জাতির বিবেককে জাগিয়ে তোলার। সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমে পথভ্রষ্ট জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার। কবিতা, নাটক, সঙ্গীত, শিল্পকলা, নৃত্য, গীতিআলেখ্য ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সামরিক শাসনকে প্রতিরোধ করা। অকুতোভয়ে এগিয়ে আসেন জোহরা তাজউদ্দিন, বেগম আইভি রহমান, সৈয়দ আহমেদ, স্থপতি মাজহারুল ইসলাম, শফিকুল আজিজ মুকুল, এস এম ইউসুফ প্রমুখ। এই পর্বে সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন বাহালুল মজনুন চুন্নু, ওবায়দুল কাদের, মমতাজ আহমেদ, লিয়াকত আলী লাকী, চাঁপা শামসুন্নাহার, জাফর ওয়াজেদ, কবি কামাল চৌধুরী, আমি উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত, মহামান্য রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই অধ্যক্ষ নূরু ও হায়দার প্রমুখ।

গোপনে সিদ্ধান্ত হয় টিএসসি’তে মঞ্চায়ন করা হবে ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ গীতি আলেখ্য। অতি সঙ্গোপনে রিহার্সেল চলে লাকীর চাচাÑ সুবিদ আলী খান টিপু এমপি’র সদরঘাটের বাসায়। প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা এই গীতি আলেখ্যে অংশ নিতে তখন ভীত-কম্পিত। বঙ্গবন্ধুর নাম তখন নিষিদ্ধ। আমার ছোট বোন নমিতা দত্ত তখন উদীয়মান টেলিভিশন-বেতার শিল্পী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা সংগীতে মেয়েদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ান। কিন্নরী কণ্ঠী গায়িকা নমিতা দত্ত তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের ছাত্রী। তুমুল জনপ্রিয়। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে তিনি অকুতোভয়ে এগিয়ে আসেন। তাকে সহায়তা করেন সাজেদ আকবর, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লর রহমানের কন্যা নাহিদ আমিন খান-সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক তরুণশিল্পী। তবলায় নমিতার সাথে ছিলো আমাদের কাকাতো ভাই চন্দন দত্ত।

বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রাম, অসাম্প্রদায়িকতা, উদারনৈতিকতা ও মানবতায় বঙ্গবন্ধুর জীবন-সংগ্রাম-দর্শন তাঁর নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের পটভূমিতে রচিত হয় ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ গীতিআলেখ্য। ধারা বর্ণনায় ছিলেন হায়দার (ফরিদপুর)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সেদিন উপচেপড়া ভীড়। মিলনায়তন ছাপিয়ে টিএসসি’র সবুজ কানায় কানায় পূর্ণ। হায়দারের ভরাট কণ্ঠের ধারা বর্ণনায় তুলে ধরা হয় সেই কালো রাতের বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের মর্মন্তুদ হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা। নমিতা দত্তের নেতৃত্বে একঝাঁক তরুণশিল্পী আবেগমথিত সুললিত কণ্ঠের অমিয় ধারায় গীত হয় ‘কাঁদো বাঙালি কাঁদো’ ‘সোনার দেশে সোনার মানুষ ঘুমিয়ে রয়েছে আজ’ মর্মস্পর্শী গান। সে করুণ সুরের মূর্ছনায় বাঙালির রুদ্ধপ্রাণের আবেগ বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় রূপ নেয়। সমবেত দর্শক শ্রোতা গভীর আবেগে-
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিলো জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা,
জনসমুদ্রে জাগিলো জোয়ার সকল দুয়ার খোলা।
কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?

বাঙালির মননে এই অনুষ্ঠান গভীর আবেদন সৃষ্টি করে। সমবেত দর্শক শ্রোতা শপথ নেয় ফ্যাসিস্ট অবৈধ সরকারকে উৎখাতের। শুরু হয় বাঙালি সংস্কৃতির মূল ধারা প্রত্যাবর্তনের নব অভিযাত্রা। সারা দেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলন বেগবান হয়ে উঠে। আন্দোলনের উত্তাল ঢেউয়ে কেঁপে উঠে স্বৈরাচারের তখতে তাউস। এটাই ছিল আনুষ্ঠানিক ভাবে ’৭৫ পরবর্তী প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিবাদ ও ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করার প্রথম প্রয়াস।

দেশ স্বাধীন হলো। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিয়ে যার যার কাজে ফিরলাম এবং দেশ গঠনে সাধ্যমতো ভূমিকা রাখতে শুরু করলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠী বন্ধু সৈয়দ আশরাফের সাথে আরো ঘনিষ্ট হয়ে ছাত্রলীগে কাজ করতে শুরু করলাম। ১৯৭২ সালে মনি ভাইয়ের পত্রিকা বাংলার বাণীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ ও সৈয়দ আশরাফের ঘনিষ্ট বন্ধু হিসেবে প্রায়ই ৩২ নম্বরে যাওয়া হতো। মাঝে মধ্যে জাতির পিতা সস্নেহে মাথায় হাত রেখে আর্শীবাদ করতেন। বলতেন ভালো করে পড়াশোনা করবি। সবাই মিলে দেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে। জাতির পিতার সস্নেহ স্পর্শ আজো উপলব্দি করি। শিহরিত হই, স্বর্গসুখ লাভ করি। বেদনায় কষ্টপাই যখন দেখি জাতির পিতা আমাদের মাঝে নেই, নির্মমতার শিকার হয়ে তাঁকে চলে যেতে হয়েছে তাঁরই হাতে গড়া দেশ থেকে, তাঁর ¯স্নেহ ধন্য, তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা গ্রহণ করা মীর জাফরদের হাতে নির্মম মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৭৫ সাল থেকেই ছাত্র সমাজ আন্দোলনে ছিল। কখনও প্রকাশ্যে কখনও গোপনে চলত কার্যক্রম। ফ্যাসিস্ট জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিরোধ কার্যক্রমে অনেকেই অত্যাচার-নির্যাতন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ১৯৭৬ সালের এক প্রত্যুষে ফ্যাসিস্ট জিয়া সরকারের নবম ডিভিশনের সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা কলেজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও বুয়েট কর্ডন করে আন্দোলনরত সকল ছাত্রনেতাদের পাইকারীহারে গ্রেফতার করে। আমিসহ অসংখ্য ছাত্রনেতাদের আর্মিরা গ্রেফতার করে নিয়ে যায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণায় (বর্তমানে শাহবাগ থানা) স্থাপিত সেনা-ছাউনিতে। সেখানে স্থাপন করা হয় সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত। সামারি ট্রায়ালের বিচারের নামে প্রহসন শুরু হয়। গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের পাইকারীহারে বেত্রদন্ড ও নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হয়। আমি দুই ঘা বেত্রদন্ডে দন্ডিত হলাম। আর্মির বেত্রাঘাত এর যন্ত্রণা আমার মন থেকে এখনও মুছে ফেলতে পারিনি।

আরও পড়ুন: বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী

দুর্জয় বাংলা

আরও পড়ুন  


Notice: Undefined variable: sAddThis in /home/durjoyba/public_html/details.php on line 859