বুধবার ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর: হাওরের নীরব কান্না

আহমেদ সামির

প্রকাশিত: ২২:৩৭, ১২ জুলাই ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর: হাওরের নীরব কান্না

মহেষখলা স্মৃতিসৌধ। ছবি: সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধে ১১ নং সেক্টরের অন্তর্গত মহেষখলা সাব-সেক্টর-১ তথা  মহেষখলা ক্যাম্পটি ছিল  তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার অধীন। ভারতের সীমান্তঘেঁষা ও হাওরবেষ্টিত দুর্গম জনপদ হওয়ায় এটি ছিল মুক্তাঞ্চল। মহেষখলা ক্যাম্পটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তিশালী ঘাঁটি।এই ক্যাম্পটি ছিল ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাঘমারা জেলার মহেষখলা থানা ও বাংলাদেশ অংশের মহেষখলা মিলিয়ে।

নেত্রকোণা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি,নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”-এর লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দীর্ঘদিনের কমান্ডার,সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ-৭১, নেত্রকোণা জেলা- সহ-সভাপতি,মহেষখলা সাব-সেক্টরের ডেপুটি কমান্ডার, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল- নেত্রকোণার সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার “মহেষখলা ক্যাম্প, ট্রাইবুনালের বিচারপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী” প্রবন্ধতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনা কমিটির প্রশাসনিক কার্যক্রম, স্মরণার্থীদের আগমন ও পূনর্বাসনকরণ, ত্রাণ বিতরণ, মুক্তিযোদ্ধা রিক্রটমেন্ট, দালাল ও অপরাধী বন্দিদের বিচারের ব্যবস্থা, রোগ-শোকের বিবরণ ও চিকিৎসা সেবাসহ নানাবিধ কর্মকান্ডের একটি সুন্দর চিত্র অংকন করেছেন । তিনি মহিষখলা ক্যাম্পের কার্যক্রম সম্পর্কে লিখেছেন – “ মহিষখলা আশ্রয় শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি পরিচালিত হতো সম্পূর্ণরূপে নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বদের দ্বারা, ভারত সরকার বা আন্তর্জাতিক রেডক্রস সংস্থা এর দায়িত্ব নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প কমিটিই এটির সম্পূর্ণ পরিচালনার কাজ করতো। মুক্তিফৌজ রিক্রট করা (ভর্তি) এবং তাদের আশ্রয় ও প্রাথমিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এ ক্যাম্প কমিটি চালাতো। ট্রেনিং পরিচালনার প্রাথমিক ব্যবস্থা ও তাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানো (তুরাতে) এবং ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে ফিরে আসার পর ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল, সিলেটের পশ্চিমাঞ্চলের অভ্যন্তরে আক্রমণ পরিচালনার জন্য নৌকা সংগ্রহ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সকল রকম দায়িত্ব সুষ্ঠভাবে পালন করতো এখানকার এই ক্যাম্প কমিটি ।নতুন ভর্তি করা মুক্তিফৌজদের ট্রেনিং সমাপ্তির পর প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা ক্যাম্প ছিলো। এখানেই তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থ সংগ্রহ, রিক্রট ও দেশের অভ্যন্তরে যোদ্ধাদের প্রেরণ, তাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শরণার্থীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপকমিটি গঠন করে বিভিন্ন সদস্যদের উপর ভার দেওয়া হতো। সে উপ কমিটিগুলো তাদের নির্বাচিত কার্য সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করতো। ক্যাম্প কমিটি প্রতিদিনই একবার কাজ পরিদর্শন এবং তাদের কাজের সমন্বয় সাধন করতো।“

প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার “মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর”-প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদ গঠন সম্পর্কে লিখেছেন – “১১ সদস্য বিশিষ্ট মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্য যারা ছিলেন – মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব নেত্রকোণার ১. ডা: আখলাকুল হোসাইন আহমেদ(সভাপতি-জুন – ডিসেম্বর), ২. সুনামগন্জের(ধর্মপাশা) আব্দুল হেকিম চৌধুরী(সভাপতি-এপ্রিল – জুন),৩. এডভোকেট কে এম ফজলুল কাদের(নেত্রকোণা), ৪. বাংলা একাডেমী ও একুশে পদক প্রাপ্ত সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী, ৫. মোঃ মেহের আলী(নেত্রকোণা সদর), ৬. ডা. জগদীশ চন্দ্র দত্ত,(নেত্রকোণা সদর),৭. জনাব আব্দুল কুদ্দুস আজাদ(মোহনগঞ্জ), ৮. জনাব নুরুজ্জামান চিশতী(বারহাট্টা),৯. জনাব মারাজ মিয়া চেয়ারম্যান,১০. জনাব ইনসান উদ্দিন খান(বারহাট্টা),  ১১. আব্দুল বারী তলুকদার(নেত্রকোণা সদর) । পরবর্তীতে জনাব আব্দুল হেকিম চৌধুরী টেকেরঘাট ক্যাম্পে চলে যান । উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল মমিন -এমপি, নেত্রকোনার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেক এমপি, কিশোরগঞ্জের এমপি আব্দুল কাদের, নেত্রকোনার হাদিছ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মহেষখলা হয়ে ইন্ডিয়া চলে যান এবং কলকাতা সহ বিভিন্ন স্থানে মু্ক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দায়িত্ত্ব পালন করতে থাকেন। ভারতীয় বিএসএফ অফিসার ক্যাপ্টেন চৌহান মাঝে মাঝে মহিষখলা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসতেন। ক্যাম্পের বিশাল দায়িত্ব পালনের জন্যে বিভিন্ন কমিটি করে দেয়া হয়। সে সব উপ কমিটির সদস্য যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন সর্বজনাব – ধর্মপাশার শওকত আলী, মণীন্দ্র চন্দ্র চৌধুরী, খালিয়াজুড়ির বিমলেন্দ্র রায় চৌধুরী, রাজাপুরের মহারাজ মিয়া, মোহনগঞ্জের প্রিন্সিপ্যাল তারা মিয়া, মহরম আলী, বিষ্ণুপুরের অক্ষয় কুমারসহ, বংশীকুন্ডার হামিদপুরের আলী আকবর, সানুয়ার বসন্ত দাশ গুপ্ত, মোহনপুরের দিলু মড়ল, রাফায়েল মাস্টার, বনগাঁর আব্দুল হক, বারহাট্টার সেকান্দর নূরী, কার্তিকপুরের রাইজুদ্দিন মেম্বার, মহিষখলার কালা মিয়া মড়ল, আব্দুর রশিদ, শ্রীপুরের সুধীর চন্দ্র হাজং, সুমাই গিরি,বারহাট্টার সেকান্দর নূরী, সাউদপাড়ার ইয়াকুব আলী পঞ্চায়েত, কালীপুরের শাহাব উদ্দিন মহালদার, মোহনপুরের কেনারাম হাজং, হরিপদ বানাই, রামপুরের ছমির ফকির প্রমুখ। পরবর্তীতে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মুজিব বাহিনী গঠনের পর মহিষখলা সাব-সক্টরের অধীনে মহিষখলা ফরেস্ট অফিসের নিকট স্থাপন করা হয় মুজিব বাহিনী ক্যাম্প। সর্বজনাব গোলাম এরশাদুর রহমান ও হায়দার জাহান চৌধুরী ছিলেন মুজিব বাহিনী নেত্রকোণা জোনের কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডার। আর তোরার নিকটস্থ খেরাপাড়া ছিল মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক সদর দপ্তর। খেরাপাড়াতে ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ জোয়ারদার বাবুল নেত্রকোণার পক্ষে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাক সাহেব ছিলেন নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ,শেরপুর,জামালপুর ও টাঙ্গাইল নিয়ে গঠিত অঞ্চলের আঞ্চলিক অধিনায়ক। মুজিব বাহিনীর মহিষখলা ক্যাম্পের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সর্বজনাব রুহুল আমীন  (নেত্রকোণা সরকারী কলেজের বর্তমান সিনিয়র প্রভাষক), মোহনগঞ্জের প্রাক্তন জাসদ নেতা গোলাম রব্বানী চৌধুরী, এ,কে,এম আশ্রাব আলী (আবুল কুরেশ) ও সচিব উজ্জ্বল কুমার দত্ত। কিছুদিনের জন্য শিবগঞ্জ রোডের স্বনামধন্য কৌতুকাভিনেতা সিরাজ উদ্দিন, মতিয়র রহমান তালুকদার , মোস্তাফিজুর রহমান রেজভী,সুলতান নুরী , খন্দকার আনিস, মনজুর উল হক ও নজরুল ইসলাম খানসহ আরো অনেকেই ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। এই ক্যাম্পেই ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরকে রিক্রুট করে উন্নত গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য সিনিয়রদেরকে দেরাদুন এর তান্ডুয়া আর জুনিয়রদের আসামের হাফলং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুজিব বহিনীর প্রশিক্ষণ মুক্তিবাহিনী অপেক্ষা ভিন্নতর ছিল। মুজিব বাহিনী পরিচালনার জন্য সকল ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের সমন্বয়ে গঠন করা হতো তৃণমূলের কমান্ড স্ট্রাকচার। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব মুজিব বাহিনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়। মুজিব বাহিনী ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদী জনযুদ্ধের জয়লাভের পরিকল্পনার ফসল। মহিষখলা ক্যাম্প পরিচালনা কমিটি প্রতিদিনই একবার সবগুলো ইউনিটের কাজ পরিদর্শন এবং তাদের কাজের সমন্বয় সাধন করতো। মহিষখলায় (বাংলাদেশের এবং মেঘালয়ের মুক্তাঞ্চল) তখন লক্ষাধিক শরণার্থী। এখানকার ক্যাম্প পরিচালণা পর্ষদ নিজেরাই শরনার্থীরা জন্যে সকল ব্যবস্থা করতো। কোনরূপ বাইরের সাহায্য পাবার সুযোগ সেখানে ছিল না। পরবর্তীতে ক্যাম্পের কাজকে তরান্বিত ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা , অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে দ্রুত ট্রেনিংয়ের জন্যে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রতিটি থানা ও গ্রামে গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেয়া হয়।
   
বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার “মহেষখলা ক্যাম্প, ট্রাইবুনালের বিচারপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী” প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্পে ট্রাইবুনাল তথা আদালত গঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে লিখেছেন – “ মুক্তিযোদ্ধা রিক্রটিং কেন্দ্রটি ছিল মহিষখলা বাংলাবাজারের সন্নিকটে একটি বড় মজবুত টিনের চৌচালা ঘরে। এটি ছিল বাংলাদেশ সরকারের বন বিভাগের কার্যালয়। সেটাতেই রিক্রটিং কেন্দ্রের সমস্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় উপ-কমিটির কয়েকজন ট্রেনিং প্রাপ্ত ও আনসার কমান্ডারের উপর। মুক্তযোদ্ধাদের ভর্তি হওয়ার পর দুপুর বারোটায় প্রায় দু’মাইল দূরে অবস্থিত ইয়্যুথ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এই ঘরটির বারান্দায়ও রিক্রটিংয়ের কাজ চলতো সকাল ৯টা থেকে ৪টা পর্যন্ত। রিক্রটিং অফিসের কাজ দেখার জন্য ক্যাম্প কমিটির সদস্যদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে সেখানে যেতেন। ক্যাম্প কমিটির চেয়ারম্যান হেকিম চৌধুরী ও ডাঃ আকলাকুল হোসেন এম.পি সাহেব প্রায়ই সেখানে যেতেন। খালেকদাদ চৌধুরীকে ক্যাম্প কমিটির সদস্য করার পর তাকেও তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। খালেকদাদ চৌধুরী মহিষখলা আসার ও ক্যাম্প কমিটির সদস্য হওয়ার দু’দিন পরই তাকে সঙ্গে করে তারা রিক্রটিং অফিসে নিয়ে যান। বিকেল দু’টার পর তারা সেখানে যেতেন। তারা দ্বিতীয় দিন সেখানে যান। এর কার্য পদ্ধতি লক্ষ্য করেন নিরবে বসে। রিক্রটিং সেন্টারের প্রহরার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের ও তা রক্ষণাবেক্ষণের পরিচালক ছিলেন একজন আনসার কমান্ডার। ঐদিন খালেকদাদ চৌধুরী বসে বসে যখন রিক্রটিং এর কাজ দেখছেন এমন সময় প্রহরারত আনসার কমান্ডার (যিনি তার পূর্ব পরিচিত এবং একজন ভাল নাম করা ফুটবল খেলোয়ার ছিলেন। বাড়ী ধরমপাশা। নেত্রকোণা মোহামেডাম টিমের সদস্য ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও সৈনিক ছিলেন। লোকটি খুবই বিশ্বস্ত এবং কর্তব্য পরায়ন) খালেকদাদ চৌধুরীর কাছে এসে কানে কানে বললেন যে, হাজতে বন্দী একটি ছেলে চৌধুরীর সাথে দেখা করতে চায়। সে নাকি উনাকে চেনে। জনাব চৌধুরী রিক্রটিং এর কাজ শেষ হওয়ার পর তাকে দেখবার কথা বলেন। এখানে যে একটি হাজত খানা আছে এবং বন্দীদের যে সেখানেই রাখা হয় তা খালেকদাদ চৌধুরী এই প্রথম জানতে পারেন এবং শুনে আশ্চর্য হন। চারটায় রিক্রটিং এর কাজ শেষ হতেই সভায় যাওয়ার জন্য সেখান থেকে চলে যান । দর্শণপ্রার্থী যুবকটির কথা মনেই হয়নি। ভিতরের বড় হলটি ছিল ধৃত শত্রু বা সন্দেহ ভাজন ও দালাল বলে কুখ্যাত বন্দীর হাজত খানা। বেশ কিছুদিন পর পর বিচারের জন্য এদের পাঠিয়ে দেওয়া হতো বিএসএফ ক্যাম্পে। এখানেই সেই ঘরের সামনে সপ্তাহে একটি নির্ধারিত দিনে বাজার ব্যবস্থাপনা উপ-কমিটির বৈঠক বসত। নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার হাওড় ও মুক্তাঞ্চলে অবস্থিত হাট-বাজারগুলি ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রাধীন ছিল। সেখানকার স্থানীয় লোকেরা বাজার ডাকের নির্দিষ্ট দিনে এখানে এসে উপস্থিত হতো। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে তা নীলামে বিক্রী করা হতো। সর্বোচচ বিডারকে সে সপ্তাহেই সেই নির্দিষ্ট হাট-বাজারের টোল তোলা বা আদায়ের বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে তারা নির্ধারিত টাকা জমা দিয়ে দেয়। ইয়্যুথ ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের খরচের বেশীর ভাগই বাজারের এই আয় থেকে করা হয়। এছাড়া আওয়ামীলীগের কর্মীরা মুক্ত এলাকার নিজ নিজ থানায় ঘুরে ঘুরে চাঁদা সংগ্রহ করে এনে এখানকার অফিসে জমা দিয়ে যেতো। তাও ছিল বেশ আশাপ্রদ এবং তা ক্যাম্প পরিচালনার কাজে ব্যয় হতো। এগুলিই ছিল ইয়্যুথ ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের ব্যয় নির্বাহের অন্যতম প্রধান সহায়ক। খালেকদাদ চৌধুরী দু’দিন পর আবার সেখানে যান। কাজ শেষে চারটার দিকে ফিরে যাবার জন্য উঠবার উপক্রম করতেই আনসার কমান্ডার খালেকদাদ চৌধুরীকে সেদিনের যুবকটির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। খালেকদাদ চৌধুরী অন্যদের একটু অপেক্ষা করতে বলে দাঁড়ান। পাশের দরজা খুলে দেওয়া হয়। যুবকটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। খালেকদাদ চৌধুরী ব্যাপার কি জানতে চান। কান্না জড়িত কন্ঠেই তার পরিচয় দিয়ে বলে যে, সে আটপাড়া থানার একজন অধিবাসী। নুরী সাহেব তাকে ধরিয়ে এনে এখানে বন্দী করে রেখেছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে যে, সে নাকি একজন দালালের ছেলে এবং নেত্রকোণা ব্যাঙ্ক লুটের অনেক টাকা নাকি তার কাছে আছে এবং তার গ্রামেরই আর একটি ছেলেকে খুন করেছে। সে খালেকদাদ চৌধুরীকে চেনে। যে পরিচয় সে দিল তাতে জনাব খালেকদাদ চৌধুরী তাকে চিনলেন। তার বাবাকে ভাল করেই চেনেন। এদের সঙ্গে গ্রাম্য দলাদলিতে নিহত সেই ছেলের বাবা ছিলো তার বাবার প্রতিদ্বন্ধী। তবে খুনের সঙ্গে সে জড়িত ছিল কি না জানা ছিল না। বিষয়টি সম্বন্ধে ভালো করে জানবার চেষ্টা করার কথা বলে বিদায় হতে যাবেন এমন সময় আর একটি লোক (গাল ভরা দাঁড়ি) খালেকদাদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলতে চায়। সেও জনাব চৌধুরীকে চেনে। তাকে পূর্বেও দু’একবার দেখেছেন। কিন্ত তখন তার দাঁড়ি ছিল না। সে জনাব চৌধুরীদের গ্রামের তার এক প্রতিবেশী আত্মীয় বলে পরিচয় দেয়। সেই নাকি এই ক্যাম্প খোলার সময় থেকে একজন মুক্তিফৌজ হিসাবে আসে এবং এ পর্যন্ত অনেক কাজ তাকে করতে হয়েছে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা ও তার পরিচালনার কাজে সাহায্য করার জন্য। আন্তরিকভাবে ও সততার সঙ্গে সে তা করেছে। কিন্তু  কিছু দিন আগে তাকে নিরস্ত্র করে বন্দী করে রাখা হয়েছে। নুরী সাহেবের কাছে বিষয়টি জানবার কথা বলে বিদায় নিতে গেলে একটি বাড়ীর কথা উল্লেখ করে বললো যে, সেখানে তার মা আছেন। তাকে দেখে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। দু’তিন দিন পর তার মার সঙ্গে দেখা করে যে কথা শুনলেন তা সহজে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তবু রাতে শুবার সময় ডাক্তার সাহেবের (ডাঃ আকলাকুল হোসেন আহমেদ) কাছে ব্যাপারটা জানতে চাইলেন। তিনি যে কথা বললেন তা আনসার কমান্ডারের মার কথার সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে তাকে এ ব্যাপারে কিছু করা দরকার বলে মত প্রকাশ করায় তিনি বললেন যে, এ ব্যাপারে তিনিও চিন্তা ভাবনা করছেন এবং সেখানে যে সব অবাঞ্চিত ব্যাপার ঘটেছে তার বিস্তারিত বিবরণ দিলেন এবং এসব ভেবেই জনাব খালেকদাদ চৌধুরীকে আনার জন্য তিনি তার ভাতিজা বুলবুলকে পাঠিয়েছিলেন। নেতৃস্থানীয় আরো কয়েকজন এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে আলোচনা করেছেন। এরপর ডাঃ আকলাকুল হোসেন আহমেদ বললেন যে, খালেকদাদ চৌধুরীসহ অন্যান্যরা  আসায় তারা এখন এসব বন্ধ করার চেষ্টা নেবেন । ক্যাম্প কমিটির অনেকের মতও তাই। বেশ কিছুদিন পর ক্যাপ্টেন চৌহান একদিন এখানে এসে যান। তারা পরামর্শ করলেন যে, বাংলাদেশের অনেক লোককে দালালী ও লুটতরাজের অজুহাতে বন্দী করে রাখা হয়েছে এবং এর সংখ্যা বর্তমানে কমে এলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। এদিকে হাজতেও স্থান সংকুলান হচেছ না। যখনই এরূপ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে ,তখনই বন্দী কিছু লোককে বিএসএফ এর হাতে বিচারের নামে সোপর্দ করে দেওয়া হতো। এরা ফিরে আসেনি কোনদিন। তবে সবার ধারণা যে, ওদের হত্যা করা হয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার ঐ প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্পে ট্রাইবুনাল তথা আদালত গঠনের বিষয়ে ক্যাপ্টেন চৌহানের সাথে বৈঠক সম্পর্কে লিখেছেন – “ তখন আলোচনা করে  সিদ্বান্ত নেওয়া হলো যে, ক্যাপ্টেন চৌহানকে সবাই মিলে অনুরোধ করে বন্দীদের  বিএসএফ-এর নিকট পাঠানোর আগে এদের সম্বন্ধে সত্যাসত্য জানবার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হবে। সেইদিনই বিকালে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তারা  ক’জন দেখা করেন। ডাঃ সাহেব, হেকিম চৌধুরী এবং আরও কয়েকজন তাতে প্রস্তাব জানালে ক্যাপ্টেন অল্পক্ষণ চিন্তা করেই বললেন যে, শুধু অনুসন্ধান নয় আপনারা এক কাজ করুন, একটি ট্রাইবুনাল গঠন করে তাদের বিচার সেই ট্রাইবুনালেই করবেন এবং আপনাদের রায়ই হবে চুড়ান্ত। এর মধ্যেই আপনারা ট্রাইবুনাল গঠন করে আমাকে(ক্যাপ্টেনকে) লিখিতভাবে জানান। আমি(ক্যাপ্টেনকে)  তা অনুমোদন করব। এরপর আরো কিছুক্ষণ অন্যান্য  ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করে তারা বিদায় হন। পরদিন ক্যাম্প কমিটির সদস্যদের এক সভা আহবান করা হয়, ট্রাইবুনাল গঠনের ব্যাপারে। একজন সদস্য মোহনগঞ্জের আওয়ামীলীগের সম্পাদক আঃ কদ্দুছ ট্রাইবুনালের সদস্য হিসেবে ডাঃ আখলাক হোসেন, আঃ হেকিম চৌধুরী ও খালেকদাদ চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন। ছাতকের এমপি শামসু মিয়া ও আরও একজন সদস্য তা সমর্থন করেন। সভায় কিছুক্ষণ নিরবতা অবলম্বন করে এক সময় হেকিম সাহেব বলেন, তিনি একাই ট্রাইবুনালের কাজ চালাবেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সদস্যরা আপত্তি করে। একজন তো বলেই ফেলে যে, এতবড় দায়িত্বপূর্ণ কাজ যাতে একটি লোকের জীবন মরণের প্রশ্ন তা একজনের উপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। তা ছাড়া ট্রাইবুনালের অর্থই হলো তিনজন নিয়ে গঠিত বিচারক মন্ডলী। তবুও হেকিম সাহেব তর্ক জুড়ে দেন। তখন সবাই এক বাক্যে প্রস্তাবের সমর্থন করায় তিনি চুপ করে যান। শেষটায় সর্বসম্মতভাবে এই প্রস্তাব হয় যে, ক্যাম্প কমিটির চেয়ারম্যানই পদাধিকার বলে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান থাকবেন। এই প্রস্তাব করা হলে তাও যথারীতি সমর্থিত হয় ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহিত হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার ঐ প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্পে ট্রাইব্যুনালের প্রথম অধিবেশন সম্পর্কে লিখেছেন – “ট্রাইব্যুনালের প্রথম অধিবেশনের দিন ধার্য্য করা হয় এবং ক্যাম্প কমিটির অফিসেই তা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে অফিসের দ্বিতীয় ঘরে প্রতিদিনই একটি নির্দিষ্ট সময়ে ট্রাইব্যুনালের  অধিবেশন বসে। প্রথমেই হাজতে বন্ধীদের তালিকা প্রস্তত করা হয়। তাতে নাম,ঠিকানা, গ্রেফতারের কারণ ও তারিখ উল্লেখ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ প্রস্ততির পরই ৩ জন বন্দীকে ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে  সাহায্য আনার সুযোগে নাকি তারা লুট করেছে। এই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ । এরই জন্য এদের বন্দী করে রাখা হয়েছে। যার নির্দেশে তাদের বন্ধী করা হয় তিনি সেকান্দর নুরী, সেখানে নেই, সাক্ষীও নেই কেউ। তাদের মহেষখলাতেই অবস্থান করতে এবং ক্যাম্পে অন্য তিনজন সদস্যের নিকট থাকতে বলা হয়। তাদেরকে তাদের অভিযোগ থেকে প্রমাণের অভাবে মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তী কেসের আসামীকে হাজির করা হয়। বাদী সেকান্দর নুরী অনুপস্থিত। বাদীর বাড়ী আটপাড়া থানায়। অভিযোগ, সে এলাকায় লুটতরাজ করে এবং একজন লোককে হত্যা করেছে। জিজ্ঞেসিত হয়ে আসামী বলে যে, লুট সে করেনি মোটেই। তবে খুনের কথা সে অকপটে স্বীকার করে বলে যে, সে এসেছিল মুক্তিবাহিনীতে ভর্তি হতে। সেকান্দর সাহেব তাকে আটপাড়া থানার তিনটি দালাল খুন করার জন্য বলে এবং তাতে কৃতকার্য হলে তার পুরস্কার হিসাবে তাকে মুক্তিফৌজে ভর্তি করা হবে। তার উল্লেখিত তিনজন দালালের মধ্যে সবাইকে খালেকদাদ চৌধুরী চেনেন, বিশেষ করে হেদায়েত উল্লা ও মুজিবর রহমান  এ-দু’জন রাজকারদের নেতা, নেত্রকোণা শহরে পাকিস্তানীদের সাহায্যে জনগণের উপর অকথ্য উৎপীড়ন চালাচেছ। প্রাইমারী শিক্ষকটি নুরীর প্রতিবেশী। তার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা। লোকটি দালাল ছিল না বরং অন্যান্য প্রাইমারী শিক্ষকদের মত ছিল অসহযোগী ও মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে। বিষয়টি খালেকদাদ চৌধুরীরও জানা ছিল। তাকে কঠোর শাস্তি দেয়ার কথা বললে তৎক্ষণাৎ সে বলে যে, আপনারা এই মুহূর্তে আমাকে গুলি করে মেরে ফেলুন। আমি একটুকুও কষ্ট পাব না। কিন্ত নুরীর (যার বিরুদ্ধে বহু নিরপরাধ মানুষকে হত্যা,নির্যাতন,র্ধষন ও লুটের অভিযোগ ছিল।) হাতে আমাকে ছেড়ে দিবেন না। তার বিরুদ্ধেও কোন সাক্ষী প্রমাণ নেই। তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং সেদিনই মহিষখলা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।”

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী ঐ প্রবন্ধতে মহেষখলা ক্যাম্পে ট্রাইব্যুনালের সবচেয়ে জটিল অধিবেশন সম্পর্কে লিখেছেন – “ এমনিভাবে বিচার চলাকালে খালেকদাদ চৌধুরী মাঝে মাঝে কয়েকজন লোককে ট্রাইব্যুনাল ঘরের সামনে দেখতে পান ঘোরা ফেরা করতে। ওরা এসে হেকিম চৌধুরী সাহেবের কাছে কি নিয়ে যেন আলাপ করে। মাঝে মাঝে ওরা উঠে গিয়ে ঘরের ভিতর তাদের(খালেকদাদ চৌধুরীদের) দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে। মনে হয় কি যেন ওরা কিছু বলতে চায়। কিন্তু সাহস করে  বলতে পারে না। খালেকদাদ চৌধুরীর মনে কেমন যেন একটা সন্দেহ  দানা বেঁধে উঠে। এদের মধ্যে একজন তার কাছে পরিচিত বলে মনে হয়। একদিন হেকিম চৌধুরী সাহেবকে খালেকদাদ চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন, ওরা কারা ? কোথাকার লোক ? ওরা এত ঘন ঘনই বা আসে কেন ? জবাবে তিনি বলেন যে, তাদের একটা কেস আছে এবং এজন্য তারা আসে। খালেকদাদ চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন, কেস তালিকায় আছে ? তিনি জানান যে আছে। তা হলে ওদের কেসটা শেষ করে দেন না কেন ? তিনি বললেন যে, ওদের কেসটা খুব জটিল এবং দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ। আমি বললাম হোক না। কেসটা শুরু করলে তো ব্যাপারটা পরিস্কার হয় এবং রায়ও দেওয়া যায়। ওদের এই আসা যাওয়াও বন্ধ হয়ে যায়। তবু তিনি বলেন যে, শেষের দিকে এ কেসটা ধরা যাবে। খালেকদাদ চৌধুরী চুপ করে গেলেন। সেদিন রাতে খালেকদাদ চৌধুরী ডাঃ আখলাক সাহেবের কাছে ব্যাপারটা কি জানতে চাইলে তিনি সব কথা খুলে বললেন। ডাঃ সাহেব বলেন, এর পিছনে এক বিরাট রহস্য ও চক্রান্ত রয়েছে। চৌধুরী সাহেব নিজেও সে জটিলতায় জড়িত। তাই এই দীর্ঘ সূত্রিতা। খালেকদাদ চৌধুরী ডাঃ সাহেবকে বললেন, চলুন না আমরা এদের কেসটা ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য তারিখ নির্ধারণ করি। তিনি তাতে কেবল সম্মত নন খুব তাড়াতাড়ি তা শুরু করবার জন্য জোরও দেন। একমত হয়ে পরদিন ট্রাইব্যুনালে বসেই খালেকদাদ চৌধুরী এই কেসটার জন্য তারিখ নির্ধারণের কথা উঠান। হেকিম চৌধুরী সাহেব আবারও জটিলতার কথা তুলে তা আরো পরে শুরু করবার জন্য মত প্রকাশ করেন। তারা দু’জন তাকে অনেক বুঝান। অনেক কথাকাটির পর তারা দু’জন একমত হয়ে দৃঢ়তা প্রকাশ করায় শেষটায় হেকীম চৌধুরী সাহেব রাজী হন। সবাই এক সপ্তাহের মধ্যে কেসটা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। সেদিনও হাফেজ মতিয়র রহমান চৌধুরীসহ সেই লোকগুলো এসেছিল। ট্রাইব্যুনালের কাজ শেষ হওয়ার পর খালেকদাদ চৌধুরী তাদের  ঘরে ফিরে যান । খাবার পর বিশ্রামের জন্য খালেকদাদ চৌধুরী যখন শুয়ে আছেন, এমন সময় সেই লোকদের তিনজন খালেকদাদ চৌধুরীর কাছে আসেন। তিনি ওদেরকে ভিতরে ডাকেন। এদের একজনকে(হাফেজ মতিয়র রহমান চৌধুরী) তিনি যেন পূর্বেই কোথাও দেখেছেন। তাই তাদের বাড়ী কোথায়,ব্যাপার কি জানতে চান। লোকটি তথা মধ্যনগর থানা ও দুগনৈ গ্রাম মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের সদস্য মেহের আলীর সমন্ধী মতিয়ুর রহমান চৌধুরী যেন সাহস ফিরে পায় এবং বলে যে, সে খালেকদাদ চৌধুরীকে চেনে। সুনামগঞ্জে চাকুরী করার সময় খালেকদাদ চৌধুরীকে দেখেছে এবং কার্যোপলক্ষে একবার তাদের গ্রামেও গিয়েছিলেন। সেখানেও খালেকদাদ চৌধুরীকে দেখেছে। দিত্বীয়বার জনাব খালেকদাদ চৌধুরী সেখানে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়। 

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী খালেকদাদ চৌধুরীর দুগনৈ গ্রামে গমন সম্পর্কে লিখেছেন, – “বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলীর নিহতের পর কোন একদনি খালেকদাদ চৌধুরী জনাব মেহের আলীর শ্বশুরের বাড়ীতে যান । মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি আকিকুর রেজা জনাব চৌধুরীকে মেহের আলীর শ্বশুরের বাড়ী লুটের ঘটনাটি খুলে বলেন। উনাকে বলেন, কিভাবে তাদের বাড়ীর ও এলাকার মেয়েদেরকে লাঞ্চিত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়া ও সার্বিকভাবে সহায়তা করার অপরাধে কিভাবে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। এরই মধ্যে জনাব খালেকদাদ চৌধুরীর উপস্থিতির কথা জানতে পেরে শত শত লোক জনাব মেহের আলীর শ্বশুরের বাড়ীতে হাজির হয়। তারা তাদের প্রিয় নেতা মেহের আলীর হত্যার বিচার চায় এবং হত্যাকারীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবী করে। জনাব  চৌধুরী তাদের কথা ধৈর্য্য সহকারে শুনেন এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের আশ্বাস প্রদান করেন। জনাব চৌধুরী মেহের আলীর শ্বশুরের পরিবারের সদস্যবৃন্দসহ দুগনৈ গ্রামের এলাকাবাসীর প্রতি মুক্তিযোদ্ধারের থাকা খাওয়া ও ক্যাম্প পরিচালনায় বিভিন্ন ভাবে সহায়তার জন্যে ধন্যবাদ জানান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, আপনাদের অবদান জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। তাদের লুট হয়ে যাওয়া সম্পদ উদ্ধারের জন্যে তিনি সরবাত্তক চেষ্টা করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। পরবর্তীতে খালেকদাদ চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে মহেষখলা ক্যাম্পের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডাঃ আখলাক হোসেন, আব্দুল হেকিম চৌধুরীর সাথে কথা বলেন। তারা বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় লুটে যাওয়া কিছু সম্পদ ফিরিয়ে দেন। যার বর্নণা মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্যবৃন্দসহ উপরোল্লেখিত জাতীয় ব্যক্তিদের লেখা ও বক্তব্য এবং অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার সম্পাদিত গবেষণাধর্মি পত্রিকা “বিজয় একাত্ত্বরে” প্রকাশিত নেত্রকোণা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দীর্ঘদিনের কমান্ডার হায়দার জাহান চৌধুরীর লেখক প্রবন্ধ ” মহেষখলা ক্যাম্প ও মুক্তিসংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী এবং মেহের আলী প্রসংগ”-থেকে পাওয়া যায়।

লোকটি তথা হাফেজ মোঃ মতিয়ুর রহমান চৌধুরী বলে যে, “বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলীকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার  পর একদিন ক’জন সশস্ত্র লোক (আনসার) ওদের এখানে যায় এবং তাদের ক্যাম্পের জন্য জিনিসপত্র দিতে বলে। তারা ভয় পেয়ে একশো মণ ধান দিয়ে দেয় এবং নিজেদের নৌকায় তা ক্যাম্পে পৌঁছিয়ে দেয়। তার সপ্তাহ দু’এক পর আরো বেশী সশস্ত্র লোক নিয়ে তাদের বাড়ী ঘেরাও করে এবং ধান চাল গরু ছাগল এবং বাড়ীর সমস্ত জিনিস আসবাবপত্র এক কথায় বাড়ীতে যা ছিলো সব নিয়ে যায়। তারা সঙ্গে এনেছিল বেশ কয়েকটি বড় নৌকা। প্রচুর ধান, কয়েকটি গরু, একটি বড় ষাঁড়সহ বাড়ীর যাবতীয় জিনিসপত্র নিয়ে যায়। বাড়ীতে ঢুকেই আমাদের হাত পা বেঁধে ফেলে। ইতিমধ্যে বাড়ীর সমস্ত জিনিসপত্র নৌকায় বোঝাই করে বিকেলের দিকে তারা চলে যায়। গ্রামের লোকজন ভয়ে আগেই পালিয়ে যায়।”

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী  মেহের আলী সম্পর্কে লিখেছেন “মেহের আলী ছিলেন আওয়ামীলীগের একজন অত্যন্ত সৎ ও নির্ভীক কর্মী এবং নেত্রকোনা মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য, মহেষখলা ক্যাম্প পরিচালনা পরিষদের সম্মানীত সদস্য,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রনেতা, নেত্রকোণা মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি (বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন), জেলা শ্রমিকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নেত্রকোণা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের  অন্যতম স্থপতি, মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার  প্রধান উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক এবং জেলা আওয়ামীলীগের শ্রম ও কৃষিবিষয়ক সম্পাদক’৭১পর্যন্ত।(ষাটের দশকে ছাত্রদের পর শ্রমিক ও কৃষক গোষ্ঠী সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল। এই দুটি গোষ্ঠী নেত্রকোণায় স্বাধিকার আন্দোলন,সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।) বঙ্গবন্ধুর ডাকে তিনি তাঁর সহযোগীদের নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে ভারতের মহেশখলা যাওয়ার পথে মধ্যনগর থানার দুগনৈ গ্রামে তাঁর শ্বশুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মধ্যনগর সহ আশপাশের এলাকার ছাত্র যুবকদেরকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করবার জন্য। ভারতের মহেষখলা ইউথ ক্যাম্প, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প এবং শরণার্থী শিবিরে তাঁর ভূমিকা ছিলো অপরিসীম। মহেষখলাতে মুক্তিযোদ্ধা ও ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনার পাশাপাশি তিনি মধ্যনগর থানার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামের ছাত্র, যুব ও সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের জন্যে সংগঠিত করেন এবং ধান, চাল সহ অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী ক্যাম্পে সরবরাহের ব্যবস্থা করেন যা কিনা যুদ্ধের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রসদ। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মেহের আলী নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের[১] সংগঠকদের মধ্যে একমাত্র শহীদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে অন্যতম (সরকার নির্ধারিত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংজ্ঞা অনুযায়ী) যিনি বীর মুক্তিমুযোদ্ধা হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৭ই মে মহেষখলা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন কালে আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন । মেহের আলী নিহত হওয়ার পরপরই মহেষখলাতে জয় বাংলা বাহিনীর নেত্রকোনা শাখার প্রধান,কোম্পানী কমান্ডার,জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি,সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ-৭১, নেত্রকোণা জেলা- সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা  মো: শামছুজ্জোহা ও মোহনগঞ্জের আমীর উদ্দিন আহমেদকে  গ্রেফতার করে হত্যা করার জন্য। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে যান। উল্লেখ্য যে,মুক্তিযুদ্ধের খরচ ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্যে, জাতীয় প্রয়োজনে বীরমুক্তিযোদ্ধা মো: শামসুজ্জোহার নেতৃত্বে বীরমুক্তিযোদ্ধা বুলবুল ইপিআর সদস্যসহ অন্যান্যদরকে নিয়ে পুলিশের অস্ত্রাগার ও নেত্রকোণার ন্যাশনাল ব্যাংকের volt ভেঙ্গে টাকা পয়সা , সোনা  সংগ্রহ করেন যে ঘটনাটি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে। কিন্তু নেত্রকোণাবাসী শহীদ মেহের আলী-র হত্যাকারীদের ক্ষমা করেননি। স্বাধীনতা লাভের অল্প কয়েকদিন পর তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম এরশাদুর রহমানের নেতৃত্বে সেইসব ঘাতকদের জনসম্মুখে হত্যা করা হয়েছিলো। “ জনাব খালেকদাদ চৌধুরী তার অমরগ্রন্থ “শতাব্দীর দুই দিগন্ত” বইটিতে জনাব মেহের আলী সম্পর্কে লিখেছেন: “মেহের আলী আমাদের লোক। তিনি আওয়ামীলীগের একজন অত্যন্ত সৎ ও নির্ভীক কর্মী। মৃত্যুকালে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও নেত্রকোনা মু্ক্তিসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য,জেলা আওয়ামীলীগের শ্রম ও কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। যদি আগামীতে সময় ও সুযোগ পাই তবে তাকে অবলম্বন করে একটা উপন্যাস লেখার ইচছা রইল।”

জনাব খালেকদাদ চৌধুরী মতিয়ুর রহমান চৌধুরীর কাছে জানতে চান এখন তারা কি চায় । তারা বলে যে, খালেকদাদ চৌধুরীকে দেখার পর থেকেই এবং তাদের ন্যায় বিচারের ধারা দেখে আশা হয়েছে যে, তারাও তাদের ব্যাপারে সুবিচার পাবে। বর্তমানে তারা মেহের আলী হত্যার বিচার ও তাদের  জিনিসপত্র ফেরত নিতে চান। তা পেলেই তারা কৃতার্থ হবেন। জনাব খালেকদাদ চৌধুরী মতিয়ুর রহমান চৌধুরীকে, পরের দিন তাদের কেসের তারিখ জানিয়ে দেবেন বলে বিদায় করেন। সেদিন সেখান থেকে পরদিন ৯টা দশটার দিকে বিচারের তারিখ জেনে যেতে বলেন। মতিয়ুর রহমান চৌধুরী বলে যে, না তাদের থাকা সম্ভব নয়। কাল সকালে তারা আবার আসবে। তাদের বাড়ী দুগনই গ্রামে। এখান থেকে নৌকা পথে দু’ঘন্টার রাস্তা। সন্ধ্যার আগেই তারা বাড়ী ফিরে যাবে। চার দাঁড়ের নৌকা দ্রুত বেয়ে তারা এখানে আসা যাওয়া করে। ওরা চলে যাওয়ার পরই জনাব খালেকদাদ চৌধুরী ডাঃ সাহেবকে ডাকেন। তিনি ঘুমিয়েছিলেন। তাকে ওদের কথা সব বলেন । এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করেন যে. কালই ওদের কেসের তারিখ দেবেন। হেকিম সাহেবকেও রাজী করাবেন। এরপর তারা তাদের দৈনন্দিন কাজে সন্ধ্যার পরই অফিসে হাজির হন। অফিসের কাজ সেরে রাত দশটা পর্যন্ত হেকিম চৌধুরী সাহেবের সঙ্গে ওদের কেসের তারিখ নির্ধারণের ব্যাপারে আলোচনা করেন। প্রথমদিকে তিনি নানা অসুবিধার কথা বলে তারিখ আরো পরে নির্ধারণের কথা জোর দিয়ে বলতে থাকেন। তাতে তারাও(খালেকদাদ চৌধুরী , ডাঃ সাহেব) তাদের মতে দৃঢ় থাকেন এবং শেষটায় তাকে বুঝাতে সমর্থ হন যে, ব্যাপারটা যতই দেরী হবে ততই তাদের ন্যায় নীতি এবং সততার প্রতি তাদের কর্মী ও সদস্যসহ বহু লোকের মন সন্ধিগ্ধ হবে। সাতদিনের মধ্যে কেসের তারিখ নির্ধারণ করেন। পরদিন সকাল আটটায় অফিসে খালেকদাদ চৌধুরী যান। দশটায় ট্রাইব্যুনালে বসেন। ইতিমধ্যে ওরাও(মতিয়ুর রহমান চৌধুরীসহ অন্যরা) এসে গেছে। তিনি তাদের ডেকে বিচারের তারিখ  জানিয়ে দেন এবং সেই দিন ঠিক দশটায় হাজির হতে নির্দেশ দেন এবং তাদের জিনিসপত্রের লিস্ট দিতে বলেন। তারা জানায়, একপ্রস্থ লিস্ট ক্যাম্প অফিসেও আছে। সেটা দেখেই সে অনুযায়ী  রায় দিন। আমরা আপনাদের সে রায়ই মেনে নেব। ওরা বিদায় হলে হেকিম চৌধুরী সাহেবকে সে তালিকায় উল্লেখিত সমস্ত জিনিস ঐদিন অফিসে এনে জমা রাখতে বলেন। হেকিম চৌধুরী জানান যে, জিনিসগুলো সেকান্দর নুরীর  বাসগৃহে রয়েছে। লিস্টও তার কাছে । তবে এক কপি তার নিজের কাছেও আছে। নির্ধারিত তারিখের দু’দিন আগেই লিষ্ট অনুযায়ী সমস্ত জিনিসপত্র আমাদের কার্যালয়ের সামনের খোলা জায়গায় জমা করা হয়। এ ব্যাপারে পুরো দু’দিন লেগে যায়। জিনিসপত্রের সংখ্যা দেখে সবাই তাজ্জব বনে যায়। এত জিনিসপত্র যে গ্রামাঞ্চলের কোন অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থের বাড়ীতে থাকতে পারে তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বড় থেকে সাইজ করে সাজানো ২৮টি তামার ও এলুমিনিয়াসের ডেকচি, ৯টি বড় বড় ষ্টীল ট্রাঙ্ক ভর্তি কাপড় চোপড় ( বেশীরভাগ শাড়ী, ব্লাউজ, ওড়না)। যার অধিকাংশই সিল্ক, নাইলন ও টিসুর সূতী বস্ত্রাদিও প্রচুর। তাছাড়া কাসা, চীনা মাটির থালা-বাটি ও অন্যান্যবাসনের সেট, বেশ কয়েকটি দামী ঘড়ি ও ঝর্না কলম, আরো অনেক কিছু । যা শহরের বিত্তবান পরিবারেও বিরল। নির্ধারিত দিনে ওরা(মতিয়ুর রহমান চৌধুরীসহ অন্যরা) এলো। দুপুর দুটা থেকে তাদের মালামাল তালিকা মিলিয়ে তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে শুরু করেন। ৪টার দিকে খালেকদাদ চৌধুরী স্নান খাওয়া সারতে চলে যান। পরে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত একটা পর্যন্ত সব কিছু ফেরৎ দেওয়ার কাজ শেষ হলে তারা রশিদ দিয়ে তা নিয়ে যায়। কাজ শেষে তারা তাদের সব জিনিস পেয়েছে কি না জানতে চাইলে কিছুক্ষণ নীরব থেকে মাতব্বর লোকটি তথা মতিয়ুর রহমান চৌধুরী বলে যে, যা পেয়েছে তাতেই তারা খুশী। আরো বলে যে, আপনারা আসাতে এবং একাজে তদারক করাতেই তারা তা পেয়েছে নচেৎ তারা এসবের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলো। তবে একটা জিনিস শুধু পেল না। সেটা পেলেই তারা সবচেয়ে বেশী খুশী হতো। সেটা কি জানতে চাইলে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে যে, মেয়েদের একটি হাত ঘড়ি। ঘড়িটি মেহের আলীর স্ত্রীর। মেহের আলী তার স্ত্রীকে বিয়েতে উপহার দিয়েছিল। আমি বলি যে, যা লিষ্টে পেয়েছি তার সবই দিয়েছি। কিন্তু এ রকম ঘড়িতো লিষ্টে নেই। যাক, তবে ঘড়িটি যে আছে তারা তা জানে ।  বোঝা গেল বলতে সাহস পাচ্ছে না। পরিষেশে মতিয়ুর রহমান চৌধুরী, মেহের আলীর হত্যার বিচার ও তার পরিবারের জন্য কিছু করার অনুরোধ করেন। এরপর তারা আর কিছু না বলে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জিনিসপত্র তাদের নৌকায় তুলতে শুরু করে। ট্রাইবুনালের সদস্যরাও  উঠে পড়েন। ”

প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার “মুক্তিযুদ্ধে মধ্যনগর”-প্রবন্ধতে মধ্যনগর উপজেলায় বীরমুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম সস্পর্কে লিখেছেন – “পরবর্তীতে মহেষখলা ক্যাম্পের কাজকে তরান্বিত ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা , অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে দ্রুত ট্রেনিংয়ের জন্যে পাঠানোর লক্ষ্যে প্রতিটি থানা ও গ্রামে গ্রামে মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেয়া হয় ।

দুগনৈ গ্রামে সংগ্রাম পরিষদ গঠন: জনাব মোঃ মেহের আলী মোঃ আকিকুর রেজাকে সভাপতি ও জনাব আব্দুল আওয়ালকে সাধারণ সম্পাদক করে মধ্যনগর থানায় প্রথম দুর্গনৈ গ্রামের সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। ঐ কমিটির অন্যান্য সদস্য যারা ছিলেন তারা হলেন-সর্বজনাব – ১.জনাব মোঃ আজাদুর রেজা(তার এক ছেলে দেশের একটি প্রসি্দ্ধ গ্রুপ অব কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এক জামাতা বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের উকিল), ২. জনাব মোঃ এখলাছ উদ্দিন চৌধুরী,৩. জনাব মোঃ আজনুর, ৪, জনাব মোঃ মান্নান আলী,৫. জনাব মোঃ তকসির,৬. জনাব মন্তাজিদ চৌধুরী, ৭. জনাব মোঃ কাঁচামনি, ৮. জনাব মোঃ আদম, ৯. জনাব মোঃ দুলই,১০. জনাব মোঃ পান্ডব আলী, ১১. জনাব মোঃ মহশিব আলী,১২. জনাব হাফেজ মোঃ মতিউর রহমান চৌধুরী,১৩. জনাব মোঃ মতিউর রহমান,১৪. জনাব মোঃ আব্দুল হাজির। সুনামগন্জ জেলার প্রখ্যাত আইনজীবি জনাব আব্দুল মতিন চৌধুরী (তার দুই ছেলে সুনামগন্জ ও সিলেটের প্রখ্যাত আইনজীবি) সব সময় তাদেরকে মূল্যবান উপদেশ দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন।

ক্যাপ্টেন গণীর দুগনৈ গ্রামে আগমন: সম্ভবতঃ এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে  ক্যাপ্টেন গণী ১৫০ জন ইসি সদস্য নিয়ে দুগনৈ গ্রামে আসেন। জনাব মেহের আলীর নেতৃত্বে এবং নিদের্শনায় তাদের সকলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় দুদিন দু-রাতের জন্যে। পরবর্তীতে মেহের আলীর নির্দেশে তাদের জন্যে নুর মিয়া চৌধুরীর বাড়ীতে মাছিমপুর ও কান্দা পাড়ায় ৩য় দিন তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ৪র্থ দিন মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের দিয়ে নিরাপদে তাদের ভারতের তুরায় যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ক্যাপ্টেন গণীর কাছে জনাব রেজা জানতে পারেন যে  তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মেজর জেনারেল (অব.) ইজাজ আহমেদ চৌধুরী ( পরবর্তীতে আশ্রমবাড়ি সাব সেক্টরের অধিনায়কের দায়িত্ব পান) আশ্রমবাড়ি সাব সেক্টরের দায়িত্বে আছেন।খুব শীঘ্রই তিনি তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। পরবর্তীতে জনাব ইজাজ জনাব রেজার মাধ্যমে   ক্যাপ্টেন মান্নান ও মহেষখলা ক্যাম্পের উর্ধতন পরিচালকবৃন্দ তথা জনাব মেহের আলী, খালেকদাদ চৌধুরীর সাথে অত্যন্ত গোপনে তথ্য আদান প্রদান করতেন। তথ্য আদান প্রদানকারী হিসেবে কাজ করেছেন জনাব সৈয়দ আলী তাং ও হাজী গাজী নবী নওয়াজ।উল্লেখ্য যে মেজর জেনারেল (অব.) ইজাজ আহমেদ চৌধুরী  জনাব রেজা ও মধ্যনগরের সাবেক কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা জনাব নুরুল ইসলামের মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে গেছেন।

মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন: পরবর্তীতে জনাব মেহের আলী এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে  জনাব মোঃ আকিকুর রেজা ভূইয়াকে সভাপতি (যিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ের আমলা হিসেবে অবসর গ্রহন করেন।) ও জনাব আব্দুল আওয়ালকে সহ-সভাপতি (পরবর্তীতে তিনি ধরমপাশা উপজেলার দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন-উল্লেখ্য-তার এক মেয়ে ডাক্তার ও জামাতা সেনবাহিনীর কর্নেল)  এবং শ্রী দূর্গেশ কিরণ তালুকদার বাদলকে (মধ্যনগর বাজার – তার এক ছেলে মধ্যনগর থানার প্রভবশালী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতা) সেক্রেটারী করে মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দেন। এই কমিটিতে অন্যান্য যারা ছিলেন সর্বজনাব- সহ সভাপতি : শ্রী হেম চন্দ্র রায় (মধ্যনগর বাজার- তার এক ছেলে মধ্যনগর থানার প্রভবশালী রাজনৈতিক নেতা ), সহ সভাপতি : শ্রী ললীত মোহন রায় (মধ্যনগর),সহ সভাপতি : আক্কেল আলী তালুকদার (বংশীকুন্ডা),সহ সাধারণ সম্পাদক : শ্রী পরিতুষ রায় (মধ্যনগর বাজার),সহ সাধারণ সম্পাদক : শ্রী প্রতাপ চন্দ্র দাস (খালপাড়া শিয়ালকান্দা),সাংগঠনিক সম্পাদক : আব্দুল আজিজ (মধ্যনগর বাজার),সহ সাংগঠনিক সম্পাদক : আব্দুল আজিজ (পিপড়াকান্দা),সহ সাংগঠনিক সম্পাদক : এখলাছ চৌধুরী (দুগনই),অর্থ সম্পাদক : মতিউর রহমান চৌধুরী হাফেজ (দুগনই- তার এক ছেলে একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানীর Chief Financial Officer-CFO,আরেক ছেলে প্রতিষ্ঠিত ব্য়বসায়ী ),সহ অর্থ সম্পাদক : শ্রী গয়নাথ চন্দ্র দাস (গোল্লা),দপ্তর সম্পাদক : হাতেম আলী মেম্বার (উত্তর বংশীকুন্ডা),সহ দপ্তর সম্পাদক : হাছান আলী মাষ্টার (উত্তর বংশীকুন্ডা),সদস্য সচিব : আব্দুল হক শাহ্ (বনগাঁও),তথ্য সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী রঘুনাথ কানু (মধ্যনগর বাজার),সহ তথ্য সংগ্রহ সম্পাদক : সত্য  নারায়ণ কানু (মধ্যনগর বাজার),সহ তথ্য সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী অমর টেইলার (মধ্যনগর বাজার),আপ্যায়ন সম্পাদক : শ্রী অধিগুপ্ত (জমশেদপুর),রসদ সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী সমরেন্দ্র ভট্টাচার্য (মধ্যনগর বাজার),সহ রসদ সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী যুগেশ সরকার (মাছিমপুর),সহ রসদ সংগ্রহ সম্পাদক : শ্রী ফুলের দত্ত (গোলাইখালী),স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক : আব্দুল করীম তালুকদার (আবিদনগর শিয়ালকান্দা),সহ স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক : শ্রী সত্যপদ রায় (মধ্যনগর বাজার),সহ  ̄স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক : আব্দুর রেজ্জাক টেইলার (মধ্যনগর বাজার) ,যোগাযোগ ও পরিবহণ সম্পাদক : শ্রী গোপাল বণিক (মধ্যনগর বাজার),সহ যোগাযোগ ও পরিবহণ সম্পাদক : শ্রী শীতেশ চন্দ্র রায় (মধ্যনগর বাজার),প্রচার সম্পাদক : শ্রী প্রদীপ তালুকদার (মাছিমপুর),সম্মানিত সদস্য: শ্রী নৃপেন্দ চন্দ্র রায় (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য : শ্রী চম্পা বনিক (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: শ্রী যাদু মালাকার (ইটাউরী),সম্মানিত সদস্য: শ্রী সমর বিজয় রায় (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: শ্রী  ̄স্বদেশ রায় (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: আব্দুল ছাদেক (মধ্যনগর বাজার),সম্মানিত সদস্য: বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালিব (মধ্যনগর),সম্মানিত সদস্য : বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ তালুকদার (সাজদাপুর)। মধ্যনগর এলাকাটি ছিল বেশ দূর্গম।বর্ষাকাল নৌকা ও শুকনো মওসমে পায়ে হাটা ছাড়া আর কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। তাই এখানে পাকসেনারা আক্রমণ করার সাহস পায়নি।তবে পাকসেনাদের দোসরেরা বেশ সক্রিয় ছিল।তারা লুটতারাজ ,খুন রাহাজানী করে বেড়াত। মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর নেতৃবৃন্দ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করে। মজুদদারের জাতে নিত্যপণ্য সামগ্রী মজুত করে চরা দামে বিক্রি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রেখে রেশনীং ব্যবস্থা চালু করা হয়। মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ পাড়া মহল্লায় পাহরার ব্যবস্থা করে যাতে দষ্কৃতীকারীরা মানুষের ক্ষতি করতে না পারে।পাশাপাশি তারা অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী সংগহ এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে ট্রেনিং এর জন্যে পাঠাতে থাকে ।

ক্যাপ্টেন মান্নানের অধীনস্থ নেতৃত্ববৃন্দের তালিকা: মহেষখলার ১১নং সেক্টরের সামরিক কমান্ডের দায়িত্তে ছিলেন মেজর আবু তাহের এবং যুদ্ধের শেষের দিকে দায়িত্ত নেন মেজর জিয়া। এই সেক্টরের দক্ষিণাংশে ক্যাপ্টেন মান্নান তার অধীনস্থ ১৫০ জন ই পি আর এবং সংগৃহীত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করেন।এই দলটির অন্যান্য যারা নেতৃত্তে ছিলেন তারা হলেন সর্বজনাব– ১.সুবেদার নায়ক মোজাফর আহমেদ ২. সুবেদার মোঃ মুরশেদ  ৩.সামরিক টেনিং মাস্টার মাহাতাব উদ্দীন ৪. সামরিক ডাক্তার আনছার আলী। এই ক্যাম্পের অধীনে সুনামগঞ্জের পশ্চিমাংশ, নেত্রকোনার উত্তরাংশে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কার্য্যক্রম বহাল রাখেন ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ইং পর্যন্ত।

মহেষখলা ক্যাম্পে খাদ্য সামগ্রী প্রেরণ: মহেষখলা আশ্রয় শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি পরিচালিত হতো সম্পূর্ণরূপে নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বদের দ্বারা।  ভারত সরকার বা আন্তর্জাতিক রেডক্রস সংস্থা এর দায়িত্ব নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প কমিটিই এটির সম্পূর্ণ পরিচালনার কাজ করতো। তাই মহেষখলা ক্যাম্পের জন্য  অর্থ, খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্যসামগ্রী স্থানীয়ভাবেই সংগৃহীত হতো। জনাব মেহের আলীর নেতৃত্ত্বে জনাব মোঃ আকিকুর রেজা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দদের নিয়ে যুবসমাজকে সংগঠিত করে বিভিন্ন ক্যাম্পে ট্রেনিং এর জন্যে পাঠাতে থাকেন। নেতৃবৃন্দ  ঐ সময় জনাব রহমত আলী তালুকদার, জনাব আক্কেল আলী তালুকদার ও আব্দুর রউফ চৌধুরীর কাছ থেকে ১৩০০ মন ধান, ১০০০ মন লাখড়ী, ৩০০শত সিরামিকের খাবার প্লেট, ৫০টি বড় চামুচ,গরু, ছাগল, মাছ ,মুরগী মহেষখালা ক্যাম্পে পাঠান যা ক্যাম্প পরিচালনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

মেজর এম এ মোত্তালিবের দুগনৈ গ্রামে আগমন: এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে মেজর মোত্তালিবের (পরবর্তীতে যিনি সাব সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন) নেতৃত্বে কয়েকশ’ সামরিক কর্মকর্তা ও ইপিআর সদস্য দুগনৈ গ্রামে আসে।মেজর মোত্তালিব নেত্রকোনার পূর্বধলা থানার কাজলা গ্রামের বাসিন্দা এবং মেহের আলীর ঘনিষ্ঠ বড় ভাই। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী ছিলেন। এলাকার মানুষ মেজর সাহেবের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দেখে মুক্তিযু্দ্ধে যাওয়ার জন্যে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হয়। মেজর মোত্তালিব এলাকার মানুষকে যার যা আছে তা নিয়ে মুক্তিযু্দ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার জন্যে আহবান জানান। জনাব মেহের আলী মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের জনাব আকিকুর রেজা ও আব্দুল আওয়ালসহ অন্যাণ্য নেতৃবৃন্দের নিয়ে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং পরের দিন তাদেরকে নৌকায় করে নিরাপদে গন্তব্যে  যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এর কিছুদিন পর জনাব মেহের আলী মধ্যনগর থানা সংগ্রাম পরিষদের সমস্ত দায়িত্ব জনাব আকিকুর রেজার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে মহেষখলা ক্যাম্পে চলে আসেন তাঁর উপর অন্যান্য দায়িত্ব পালনের জন্য। মেহের আলীর নির্দেশক্রমে জনাব আকিকুর রেজা তার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব স্বচ্ছতার সাথে পালন করতে থাকেন। পূর্বের মতোই তিনি  অন্যান্য জেলা হতে আগত ভারত গামী মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ও ক্যাম্পে খাদ্য সামগ্রী প্রেরণ করতে থাকেন। খাদ্য সামগ্রী ছিল ইয়ুথ ক্যাম্প, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ও রিফিউজি ক্যাম্প পরিচালনার অন্যতম রসদ যাহা ছাড়া যুদ্ধই পরিচালনা করা সম্ভব হতো না।

মধ্যনগর উপজেলার বীরমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা: মধ্যনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব  কমান্ডার মোঃ নুরুল ইসলাম, মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি জনাব মোঃ আকিকুর রেজা ভূইয়া (যিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ের আমলা হিসেবে অবসর গ্রহন করেন।), ইউনুছ মিয়া,মোঃ আতাউর রহমান, মোঃ আব্দুল জব্বার, মোঃ আব্দুল বারী খন্দকার, মোঃ মোতালেব, মোঃ নূরুল হক, মোঃ আব্দুর রহিম, বীরবল চন্দ্র দাস, মোঃ সুরুজ আলী, শুধাংশু রঞ্জন বিশ্বাস, মোঃ আব্দুল বারী খন্দকার , নুরুল ইসলাম , মরুহম আব্দুর রউফ, কমান্ডার মোঃ নুরুল ইসলাম, আব্দুল বারী আহম্মদ মোঃ গাজী আব্দুল হক, মোঃ পান্নু মিয়া, মোঃ,মোঃআঃ বারিক, মোহাম্মদ আলী, আলী আমজাদ,বেণু ভূষণ দাস, রমা রাণী দাস প্রমুখ।

মধ্যনগরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা: বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলী শহীদ হওয়ার পর দুগনৈ গ্রামে তার শ্বশুর বাড়ীটি দুই দুই বার লুট করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার অপরাধে ও পূর্বশত্রুতার জেরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাতজন বীর সহযোদ্ধাকে দুষকৃতিকারীরা (যাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় লুন্ঠন ও নিরাপরাধ মানুষদেরকে হত্যার বহু অভিযোগ ছিল) হত্যা করে।  শহীদ মেহের আলীসহ যে সকল সহযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তারা হলেন – শহীদ তাজনুর,শহীদ কাচা আবু,শহীদ সল্লুক চৌধুরী, শহীদ লাল চান, শহীদ আব্দুল লতিফ, শহীদ আব্দুল হাসিম, শহীদ আব্দুল বাহার।”

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী তার “মহেষখলা ক্যাম্প, ট্রাইবুনালের বিচারপতি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক খালেকদাদ চৌধুরী” প্রবন্ধতে লিখেছেন -“জুলাই থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানী ব্যাপকভাবে আসতে শুরু করে। পূর্বেও এসেছে। তবে এত ব্যাপকভাবে নয়। ওরা সাধারণত দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, নাজিরপুর এবং বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনীর ঘাঁটি তাদের চলাচলের উপর আক্রমণে ছিলো সীমাবদ্ধ। এ সময় নৌকা চলার পথ সুগম হওয়ায় এবং পানিতে ভরে যাওয়ায় মুক্তিবাহিনীর কোম্পানীগুলোকে সুনামগঞ্জ মহকুমা এবং ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন স্থানে ও ময়মনসিংহ সদরের কোন কোন স্থানে আক্রমণ পরিচালনার জন্য প্রেরিত হতে থাকে।কোম্পানীগুলি মহিষখলা এসে পৌঁছার পরই ক্যাম্প কমিটি সেখানে নৌকা যোগাড় করে তাদের দেশের অভ্যন্তরে পাঠানোর ত্বরিৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে এই বিরাট হাওর এলাকার সবটাই মুক্ত এলাকা ছিল এবং তখন থেকে মুক্তিবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে। এসব কোম্পানীগুলি নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের তৎপরতা চালায়। কলমাকান্দা, বারহাট্টা, ধরমপাশা, মোহনগঞ্জ, আটপাড়া, মদন, খালিয়াজুরী, ইটনা, তাড়াইল, নিখলী, করিমগঞ্জ, অষ্টগ্রাম, বাজিতপুর, নান্দাইল, কেন্দুয়া, দিরাই প্রভৃতি থানার পাক সেনাদের ঘাটিগুলি ছিল এদের লক্ষ্যস্থল। সুযোগ মতো এসব ঘাটিতে আকস্মিকভাবে আক্রমণ চালিয়ে শত্রুদের থানা প্রাঙ্গণেই আটকে রাখে। থানার বাইরে বেরুবার দু:সাহস ওদের হতো না। কোনদিন বের হলেই অতর্কিত আক্রমণের শিকার হতে হতো। কোন কোন স্থানে খন্ড যুদ্ধও হয়েছে। সবখানেই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে মার খেয়েছে ভীষণভাবে।”

মধ্যনগরে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক: মহেষখলায় সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২-১৩ সালে নির্মিত হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মৃতিসৌধ। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র(Bangladesh Muktijudho Research Institute,Australia – এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান)–এর মাধ্যমে অত্র এলাকার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ক্যাম্প, মধ্যনগর, দুগনৈসহ অন্যান্য গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম ও মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানের কথা সবিস্তারে জানতে পারে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র-এর উৎসাহ ও উদ্দীপনায় এলাকাবাসী ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ স্মৃতি পরিষদ-সুনামগঞ্জ,মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার ও শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাব-দুগনৈ,মধ্যনগর নামে তিনটি সংগঠন গড়ে তুলে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র “মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার” ও “শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাব” নামক প্রতিষ্ঠান দুটিকে বই পুস্তক ও খেলাধুলার সামগ্রী দিয়ে সার্বিকভাবে সহায়তা করছে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, শহীদ স্মৃতি পরিষদ-সুনামগঞ্জ,মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার ও শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাবের মাধ্যমে ক্রীড়া ও অত্র এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী সংগ্রহ ও  বীর মুক্তিযোদ্ধা , মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের সদস্য ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মান্না এবং আর্থিক অনুদানের প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্র মধ্যনগর ও মহেষখলা ক্যাম্পের ঘটনাবলী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী  নিয়ে “মুক্তিযুদ্ধে মহেষখলা ও মধ্যনগর : হাওরের নীরব কান্না” নামে একটি বই প্রকাশ করেছে।

কৃতজ্ঞতা : নেত্রকোণা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি,নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ” মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণা”-এর লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দীর্ঘদিনের কমান্ডার হায়দার জাহান চৌধুরী. প্রখ্যাত ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ননী গোপাল সরকার ,বাংলাদেশ শহীদ স্মৃতি গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এম কে জামান, মধ্যনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বীর মুক্তিযোদ্ধা সর্বজনাব  কমান্ডার নুরুল ইসলাম ইউনুছ মিয়া,, মোঃ আতাউর রহমান, মোঃ আব্দুল জব্বার, মোঃ আব্দুল বারী খন্দকার, মোঃ মোতালেব, মোঃ নূরুল হক, মোঃ আব্দুর রহিম, বীরবল চন্দ্র দাস, মোঃ সুরুজ আলী  প্রমুখ , মধ্যনগর থানা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি জনাব মোঃ আকিকুর রেজা ভ‚ইয়া (যিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ের আমলা হিসেবে অবসর গ্রহন করেন।), সহ-সভাপতি জনাব শ্রী হেম বাবু  ও বাদল চন্দ্রের সন্তানবৃন্দ, দুগনৈ গ্রামে সংগ্রাম পরিষদের জনাব মোঃ মতিউর রহমান, জনাব মোঃ আব্দুল হাজির ও জনাব মোঃ আজনুর প্রমুখ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের জনাব শাহীনুর রেজা তাং, জনাব এমদাদ হোসন, জনাব রেজুয়ান আহমেদ প্রমুখ , সুনামগঞ্জ, ও শহীদ স্মৃতি স্পোর্টিং-এর জনাব মাঃ সাগর তাং,সিরাজ হোসেন প্রমুখ নেতৃবৃন্দে ও এলাবাসীর সহযোগিতা ছাড়া  এই সকল তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হত না।

আরও পড়ুন: বঙ্গবন্ধুর বজ্রকঠিন কন্ঠের আওয়াজ এখনও নেত্রকোণার হাওরে ঢেউ তুলে: বীর মুক্তিযোদ্ধা উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত

দুর্জয় বাংলা

তথ্যসূত্র: ১


Notice: Undefined variable: sAddThis in /home/durjoyba/public_html/details.php on line 859