মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার পাঠাগার

একটি আলোর ঘর

প্রকাশিত: ১২:২৫, ২২ আগস্ট ২০২৬

একটি আলোর ঘর

একটি আলোর ঘর

গ্রামের নাম জুড়াইল। ছোট্ট একটি গ্রাম, চারপাশে সবুজ মাঠ, পুকুর আর গাছগাছালিতে ঘেরা। গ্রামের মানুষের জীবনে নানা ব্যস্ততা থাকলেও বই পড়ার সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের অনেকেই বইয়ের চেয়ে মোবাইল ফোনেই বেশি সময় কাটাত।

একদিন গ্রামের কয়েকজন তরুণ ও শিক্ষিত মানুষ মিলে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেন। সবার আলোচনায় উঠে এলো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম—আব্দুল জব্বার। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের স্মৃতি গ্রামের মানুষের হৃদয়ে আজও অমলিন। তাঁর স্মৃতিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করে পাঠাগারের নাম রাখা হলো—“বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার পাঠাগার”।

পাঠাগার প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে সেখানে বই জমতে শুরু করল। কেউ দিলেন উপন্যাস, কেউ ইতিহাসের বই, কেউ বিজ্ঞানবিষয়ক বই, আবার কেউ শিশুদের জন্য গল্প ও ছড়ার বই। গ্রামের মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বই দিয়ে পাঠাগারটিকে সমৃদ্ধ করতে লাগলেন।

প্রতিদিন বিকেলে পাঠাগারের দরজা খুলে গেলে দেখা যেত এক অন্যরকম দৃশ্য। স্কুলের শিক্ষার্থীরা বই পড়ছে, তরুণরা পত্রিকা ও সাময়িকী পড়ছে, কেউ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস খুঁজছে, আবার কেউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে জ্ঞান অর্জন করছে।

একদিন সাজিয়া আফরিন ওয়ানিয়া নামের এক কিশোরী পাঠাগারে এসে একটি মুক্তিযুদ্ধের বই হাতে নিল। বইটি পড়তে পড়তে সে জানতে পারল, দেশের স্বাধীনতার জন্য কত মানুষ জীবন দিয়েছেন। সে আবেগাপ্লুত হয়ে পাঠাগারের দেয়ালে টাঙানো বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, “যাঁরা দেশের জন্য এত কিছু করেছেন, তাঁদের ঋণ আমরা কীভাবে শোধ করব?”

পাশে বসে থাকা পাঠাগারের সভাপতি আলা উদ্দিন সাহেব মৃদু হেসে বললেন, “দেশকে ভালোবাসবে, মন দিয়ে পড়াশোনা করবে, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলবে—এটাই তাঁদের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় সম্মান।”

সেদিন থেকেই সাজিয়া আফরিন ওয়ানিয়া জীবনে পরিবর্তন এলো। সে নিয়মিত পাঠাগারে আসতে শুরু করল। শুধু নিজে বই পড়ত না, বন্ধুদেরও পাঠাগারে নিয়ে আসত। কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামের আরও অনেক কিশোর-কিশোরী বই পড়ায় আগ্রহী হয়ে উঠল।

পাঠাগারটি শুধু বই পড়ার জায়গা রইল না; এটি হয়ে উঠল গ্রামের মানুষের মিলনকেন্দ্র। সেখানে আয়োজন হতে লাগল বইপাঠ প্রতিযোগিতা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আলোচনা, শিক্ষামূলক সভা, কবিতা পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

একদিন পাঠাগারের গ্রামের এক বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম ফারুখী বললেন, “একটি পাঠাগার শুধু বই রাখে না, এটি মানুষের মনে আলো জ্বালায়। যে আলো জ্ঞান দেয়, যে আলো মানুষকে দেশকে ভালোবাসতে শেখায়।”

সবাই নীরবে কথাগুলো শুনল।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। পাঠাগারের জানালা দিয়ে আলো ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের অন্ধকার পথে। সেই আলো যেন শুধু একটি ঘরের আলো নয়—এটি জ্ঞান, শিক্ষা, দেশপ্রেম ও ভবিষ্যতের আলোর প্রতীক।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার পাঠাগার তাই আজ গ্রামের মানুষের কাছে শুধু একটি পাঠাগার নয়; এটি একটি স্বপ্ন, একটি স্মৃতি এবং নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করার একটি নিরন্তর প্রয়াস।

শিক্ষণীয় কথা “একটি বই একটি জীবন বদলাতে পারে, আর একটি পাঠাগার বদলে দিতে পারে একটি পুরো প্রজন্মকে।”

আরও পড়ুন: শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নেত্রকোনা

দুর্জয় বাংলা


Notice: Undefined variable: sAddThis in /home/durjoyba/public_html/details.php on line 859