সোমবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেকদাদ চৌধুরী

প্রকাশিত: ১৮:১৭, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩

আপডেট: ১৮:২১, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেকদাদ চৌধুরী

বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেকদাদ চৌধুরী

মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। মুক্তিযোদ্ধা তথা জাতির বীর সন্তানেরা কোন পরিবার বা গোষ্ঠীর নয় তারা পুরো বাঙ্গালী জাতির  অহংকার। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম  সংগঠক  বীর মুক্তিযোদ্ধা  খালেকদাদ চৌধুরী  ছিলেন একাধারে একজন  প্রাবন্ধিক, গল্পকার, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক এবং একজন রাজনীতিবিদ। সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে তাঁকে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে  ভূষিত করে।

জন্ম:
খালেকদাদ চৌধুরী ১৯০৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোণা জেলার মদন উপজেলার চানগাঁও জন্মগ্রহণ করেন।তার পিতা: নওয়াব আলী চৌধুরী এবং মাতা নজমুননেছা চৌধুরী।

শিক্ষা জীবন:
নাজিরগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে    পঞ্চম শ্রেণী পাশ করেন। ১৯১৬ সালে মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। এর পরের বছর তিনি জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দত্ত হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং১৯২৪ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস পাশ করেন।    কলকাতার লর্ড রিপন কলেজ ও পরে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে  ইংরেজি বিভাগে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হন। খালাতো বোন হামিদা চৌধুরীকে বিয়ে করে সংসারজীবন শুরু করেন।

কর্ম জীবন:
১৯২৯ সালে কলকাতা মিডল্যান্ড ব্যাংকের নেত্রকোণা শাখায় সুপারভাইজার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে কলকাতা করপোরেশনের একটি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৪ সালে তিনি জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসাবে সরকারী চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত নেত্রকোণা সুনমগঞ্জ ও সিলেটে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

সাহিত্যিক জীবন:
ব্যাংকে কর্মরত অবস্থায় তিনি লেখালেখি শুরু করেন। আস্তে আস্তে ব্যাংকের কাজের চেয়ে লেখালেখিতেই তিনি বেশি আনন্দ অনুভব করেন। তার প্রথম কবিতা ছাপা হয় বিকাশ নামের একটি পত্রিয়ায়, যা প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে এবং এর সম্পাদক ছিলেন কবি বন্দে আলী মিয়া, কবি আব্দুল কাদির ও আবুল কালাম শামসুদ্দিনের অনুপ্রেরণায় তার লেখালেখি আরও গতি পায়। স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় বাড়তি আয়ের জন্য আবুল মনসুর আহম্মদ সম্পাদিত দৈনিক কৃষক -এর কিশোর সাহিত্যপাতা ‘চাঁদের হাট’ শাহাদাত চৌধুরী ছদ্মনামে পরিচালনা করেন। তখন সবার কাছেই তিনি "মামা" নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৪১ খ্রীস্টাব্দে তিনি কাজী নজরল ইসলামের    সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পান। তিনি নজরুলের সাহিত্য আড্ডাগুলোয় নিয়মিত যোগ দিতেন। নজরুল সম্পাদিত দৈনিক নবযুগ এ তিনি সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি "আগুনের ফুলকি" নামে কিশোর পাতা "আতশবাজ" ছদ্মনামে পরিচালনা করেন। মাসিকসওগাত.মাসিক মোহাম্মদী, মাসিকমাহে নাও,দিলরুবা, যুগবণী,সচিত্র সন্ধানী,পাকিস্তন খবর,প্রতিধবনি,  প্রভৃতি সাহিত্যপত্রে তিনি নিয়মিত লিখেছেন। তিনি নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক উত্তর আকাশ ও সাহিত্য সাময়িকী সৃজনী সম্পাদনা ও নিয়মিত প্রকাশ করে তখনকার নবীন লেখকদের উৎসাহিত করেন।নির্মলেন্দু গুণ,রফিক আজাদ,শান্তিময় বিশ্বাস, হেলাল হাফিজের মতো আরও অনেকেই তখন উত্তর আকাশ ও সৃজনী সাহিত্যপত্রিকায় লিখতেন।

সমাজ সেবা:
তিনি দীর্ঘদিন আদর্শ শিশুকিশোর সংগঠন নেত্রকোণা মধুমাছি কঁচি-কাঁচার মেলার পরিচালক ও আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত  রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করেন। তিনি নেত্রকোণায় সাধারণ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান:
খালেকদাদ চৌধুরী ছিলেন মহিষখলা ক্যাম্প পরচিালনা কমিটির সদস্য। মহিষখলা আশ্রয় শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পটি পরিচালিত হতো সম্পূর্ণরূপে নেত্রকোণা মহকুমা ও সুনামগঞ্জ মহকুমার আওয়ামীলীগ নেতৃত্বদের দ্বারা,  ভারত সরকার বা আন্তর্জাতিক রেডক্রস সংস্থা এর দায়িত্ব নেয়নি। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প কমিটিই এটির সম্পূর্ণ পরিচালনার কাজ করতো। মুক্তিফৌজ ভর্তি করা এবং তাদের আশ্রয় ও প্রাথমিক প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা এ ক্যাম্প কমিটি চালাতো। ট্রেনিং পরিচালনার প্রাথমিক ব্যবস্থা ও তাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানো (তুরাতে) এবং ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে ফিরে আসার পর ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চল, সিলেটের পশ্চিমাঞ্চল অভ্যন্তরে আক্রমণ পরিচালনার জন্য নৌকা সংগ্রহ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সকল রকম দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতো এখানকার এই ক্যাম্প কমিটি।নতুন ভর্তি করা মুক্তিফৌজদের ট্রেনিং সমাপ্তির পর প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা ক্যাম্প ছিলো। এখানেই তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থ সংগ্রহ, রিক্রটিং ও দেশের অভ্যন্তরে যোদ্ধাদের প্রেরণ তাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শরণার্থীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপকমিটি গঠন করে বিভিন্ন সদস্যদের উপর ভার দেওয়া হতো। সে উপ কমিটিগুলো তাদের নির্বাচিত কার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতো। ক্যাম্প কমিটি প্রতিদিনই একবার কাজ পরিদর্শন এবং তাদের কাজের সমন্বয় সাধন করতো।মহিষখলায় (বাংলাদেশের এবং মেঘালয়ের মুক্তাঞ্চল) তখন লক্ষাধিক শরণার্থী। এখানকার শরনার্থীরা সবাই নিজেরাই তাদের সকল ব্যবস্থা করতো। কোনরূপ বাইরের সাহায্য পাবার সুযোগ সেখানে ছিল না।

মহিষখলা ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা: 
খালেকদাদ চৌধুরী আসার পর তার এবং পূর্বে আগত ডাঃ সাহেবের বাস করার জন্য ক্যাম্প কমিটি তৎপর হয়ে উঠেন। ভাল টিলা তাদের জন্য নির্ধারিত হয় এবং স্থানটি স্থানীয়ভাবে লীজ নিয়ে জঙ্গল পরিস্কার করে সেখানে একটি ঘর তৈরি করা হয় তাদের থাকার জন্য। কদিন পরই আর একটি ঘর তার পাশেই তৈরি করা হয়। ডাঃ সাহেবের পরিবার ইতিমধ্যে এসে পড়ায় এটির প্রয়োজন দেখা দেয়। দ্বিতীয় ঘরটিতে অর্ধেকটায় খালেকদাদ চৌধুরীর থাকার ব্যবস্থা হয় এবং বাকী অর্ধেকটায় একজন ডাক্তারের পরিচালনায় চিকিৎসা কেন্দ্র ও ঔষধ সরবরাহের বন্দোবস্ত করা হয়। সুখারী ইউনিয়নের ডাঃ যথীন্দ্র চৌধুরীকে চিকিৎসা ও ঔষধ পত্রের ভার দেওয়া হয়। অসুস্থ শরণার্থীদের বা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হতো এখানেই। গুরুতরভাবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের আরো উন্নততর চিকিৎসার জন্য তুরা পাঠিয়ে দেওয়া হতো।

মহিষখলা ক্যাম্প: 
ক্যাম্প অফিস থেকে বেশ কিছু দূরে খালের তীরে এক বিস্তৃত সমতল স্থানে মুক্তিফৌজ ভর্তির জন্য আগত যুবকদের থাকা খাওয়ার এবং প্রাথমিক রাইফেল ট্রেনিং, সম্মুখ যুদ্ধ ও গেরিলা আক্রমণ প্রশিক্ষণের সকল রকমের ব্যবস্থাই ছিলো কয়েকজন ট্রেনিং প্রাপ্ত অভিজ্ঞ আনসার কমান্ডারের উপর। ক্রমে দ্রুত মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণেচছুকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তাদের ব্যবস্থাও দ্রুত গ্রহণ করা হয়। এই ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় একটি উপ কমিটির উপর। প্রতিদিনই দুবার ক্যাম্প কমিটির সদস্যবৃন্দ সেখানে গিয়ে সেখানকার কার্যকলাপ ও তার অগ্রগতি পরিদর্শন ও আরো উন্নততর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্বন্ধে আলোচনা করতেন। প্রতি সপ্তাহে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিফৌজের উচচতর ট্রেনিং এর জন্য তুরা ট্রেনিং কাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দিন দিন এদের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে গিয়ে শেষে এমন পর্যায়ে পৌছে যে নতুন ফৌজ ভর্তির ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি এবং সীমিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, সিলেট জেলার পশ্চিম ও ময়মনসিংহ জেলার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিস্তীর্ন হাওড় এলাকার সর্বত্র ছিল সম্পূর্ণ মুক্তাঞ্চল। তাই এই দুই জেলার শরণার্থী এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণেচ্ছুকদের আগমন বেড়ে যায়। বালাট, বালাঘাট, মহাদেও এবং বিশেষ করে মহিষখলার উপরই আগমনের চাপ পড়ে অত্যধিক। কারণ সেখানে বিশেষ করে বাংলাদেশের বিস্তৃত সমতল ভুমি ছিল এর বিশেষ আকর্ষণ। দেখতে দেখতে সেই বিস্তৃত সমতল এলাকার সমস্ত জঙ্গল পরিস্কার করে যে যেখানে পারে নিজ নিজ আশ্রয়স্থল নির্দিষ্ট করে নিয়ে বসবাস করার ব্যবস্থা করে। এখানকার শরণার্থীর সংখ্যা তখন দু’লাখের উপর। মুক্তিযোদ্ধা রিক্রটিং কেন্দ্রটি ছিল মহিষখলা বাংলাবাজারের সন্নিকটে একটি বড় মজবুত টিনের চৌচালা ঘরে। এটি ছিল বাংলাদেশ সরকারের বন বিভাগের কার্যালয়। সেটাকেই রিক্রুটিং কেন্দ্রের সমস্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় উপ-কমিটির কয়েকজন ট্রেনিং প্রাপ্ত ও আনসার কমান্ডারের উপর। তাদের ভর্তি হওয়ার পর দুপুর বারোটায় প্রায় দু’মাইল দূরে অবস্থিত ইয়্যুথ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হতো।

মহিষখলা ক্যাম্পে ট্রাইবুনাল গঠন:
বাংলাদেশের অনেক লোককে দালালী ও লুটতরাজের অজুহাতের পাশাপাশি অনেক নিরীহ লোককে ব্যক্তগিত ও রাজনতৈকি শত্রুতার কারণে বন্দী করে রাখা হয়েছে এবং এর সংখ্যা বর্তমানে কমে এলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। এদিকে হাজতেও স্থান সংকুলান হচেছ না। যখনই এরূপ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে তখনই বন্দী কিছু লোককে বিএসএফ এর হাতে বিচারের নামে সোপর্দ করে দেওয়া হতো। এরা ফিরে আসেনি কোনদিন। তবে সবার ধারণা যে ওদের হত্যা করা হয়েছে।তখন আলোচনা করে  সিদ্বান্ত নেওয়া হলো যে ক্যাপ্টেন চৌহানকে সবাই মিলে অনুরোধ করে বন্দীদের  বিএসএফ এর নিকট পাঠানোর আগে এদের সম্বন্ধে সত্যাসত্য জানবার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হবে।সেইদিনই বিকালে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তারা  কজন দেখা করেন। ডাঃ সাহেব, হেকিম চৌধুরী এবং আরও কয়েকন তাতে প্রস্তাব জানালে ক্যাপ্টেন অল্পক্ষণ চিন্তা করেই বললেন, যে শুধু অনুসন্ধান নয় আপনারা এক কাজ করুন, একটি ট্রাইবুনাল গঠন করে তাদের বিচার সেই ট্রাইবুনালেই করবেন এবং আপনাদের রায়ই হবে চুড়ান্ত। এর মধ্যেই আপনারা ট্রাইবুনাল গঠন করে আমাকে(ক্যাপ্টেন) লিখিতভাবে জানান। আমি(ক্যাপ্টেন)  তা অনুমোদন করব। এরপর আরো কিছুক্ষণ অন্যান্য  ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করে তারা বিদায় হন। পরদিন ক্যাম্প কমিটির সদস্যদের এক সভা আহবান করা হয়, ট্রাইবুনাল গঠনের ব্যাপারে। একজন সদস্য মোহনগঞ্জের আওয়ামীলীগের সম্পাদক আঃ কদ্দুছ ট্রাইবুনালের সদস্য হিসেবে ডাঃ আখলাক হোসেন, আঃ হেকিম চৌধুরী ও খালেকদাদ চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করেন। ছাতকের এমপি শামসু মিয়া ও আরও একজন সদস্য তা সমর্থন করেন।

মহিষখলা ক্যাম্পে ট্রাইব্যুনালের প্রথম অধিবেশন:
ট্রাইব্যুনালের প্রথম অধিবেশনের দিন ধার্য্য করা হয় এবং ক্যাম্প কমিটির অফিসেই তা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে অফিসের দ্বিতীয় ঘরে প্রতিদিনই একটি নির্দিষ্ট সময়ে ট্রাইব্যুনালের  অধিবেশন বসে।প্রথমেই হাজতে বন্ধীদের তালিকা প্রস্তত করা হয়। তাতে নাম,ঠিকানা, গ্রেফতারের কারণ ও তারিখ উল্লেখ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ প্রস্ততির পরই ৩ জন বন্ধীকে ট্রাইব্যুনালের সামনে হাজির করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে  সাহায্য আনার সুযোগে নাকি তারা লুট করেছে। এই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এরই জন্য এদের বন্ধী করে রাখা হয়েছে।যার নির্দেশে তাদের বন্ধী করা হয় তিনি সেকান্দর নুরী সেখানে নেই। সাক্ষীও নেই কেউ। তাদের মহেষখলাতেই অবস্থান করতে এবং ক্যাম্পে বর্তমান তিনজন সদস্যের নিকট থাকতে বলা হয়। তাদেরকে তাদের অভিযোগ থেকে প্রমাণের অভাবে মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তী কেসের আসামীকে হাজির করা হয়। বাদী সেকান্দর নুরী অনুপস্থিত। বাদীর বাড়ী আটপাড়া থানায়। অভিযোগ সে এলাকায় লুটতরাজ করে এবং একজন লোককে হত্যা করেছে। জিজ্ঞেসিত হয়ে আসামী বলে যে, লুট সে করেনি মোটেই। তবে খুনের কথা সে অকপটে স্বীকার করে বলে যে, সে এসেছিল মুক্তিবাহিনীতে ভর্তি হতে। সেকান্দর সাহেব তাকে আটপাড়া থানার তিনটি দালাল খুন করার জন্য বলে এবং তাতে কৃতকার্য হলে তার পুরস্কার হিসাবে তাকে মুক্তিফৌজে ভর্তি করা হবে। তার উল্লেখিত তিনজন দালালের মধ্যে সবাইকে চিনি, বিশেষ করে হেদায়েত উল্লা ও মুজিবর রহমান  এ দু’জন রাজকারদের নেতা, নেত্রকোণা শহরে পাকিস্তানীদের সাহায্যে জনগণের উপর অকথ্য উৎপীড়ন চালাচেছ। 

প্রাইমারী শিক্ষকটি নুরীর প্রতিবেশী।  তার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা। লোকটি দালাল ছিল না বরং অন্যান্য প্রাইমারী শিক্ষকদের মত ছিল অসহযোগী ও মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে। বিষয়টি খালেকদাদ চৌধুরীরও জানা ছিল। তাকে কঠোর শাস্তি দেয়ার কথা বললে তৎক্ষণাৎ সে বলে যে আপনারা এই মুহূর্তে আমাকে গুলি করে মেরে ফেলুন। আমি একটুকুও কষ্ট পাব না। কিন্ত নুরীর (যার বিরুদ্ধে বহু নিরপরাধ মানুষকে হত্যা,নির্যাতন,র্ধষন ও লুটের অভিযোগ ছিল।)হাতে আমাকে ছেড়ে দিবেন না। তার বিরুদ্ধেও কোন সাক্ষী প্রমাণ নেই। তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং সেদিনই মহিষখলা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে  বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলী  আততায়ীর গুলিতে মহেষখলা ক্যাম্পের পাশে নিহত হন।মেহের আলী  ছিলেন আওয়ামীলীগের লোক। একজন অত্যন্ত সৎ এবং নির্ভীক কর্মী।  মেহের আলী ছিল নেত্রকোনা মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য, মহেষখলা ইউথ ক্যাম্প  পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রনেতা, নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি(জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন পূর্বপাকিস্তান আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন), জেলা শ্রমিকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি,নেত্রকোনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের  অন্যতম স্থপতি, মধুমাছি কচিকাঁচার মেলার  প্রধান উদ্যেক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক এবং জেলা আওয়ামীলীগের শ্রম ও কৃষিবিষয়ক সম্পাদক'৭১পর্যন্ত।  বঙ্গবন্ধুর ডাকে তিনি তাঁর সহযোগীদের নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে ভারতের মহেশখলা যাওয়ার পথে মধ্যনগর থানার দুগনৈ গ্রামে তাঁর শ্বশুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মধ্যনগর সহ আশপাশ এলাকার ছাত্র যুবকদেরকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত করবার জন্য। ভারতের মহেষখলা ইউথ ক্যাম্প, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প এবং শরণার্থী শিবিরে তাঁর ভুমিকা ছিলো অপরিসীম। তিনি মহেষখলা ইউথ ক্যাম্প  পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। 

মহেষখলা ক্যাম্পে মূলত নেত্রকোণা ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং সহ অন্যান্য রিফিউজি ক্যাম্প পরিচালনা করা হতো। মহেষখলাতে মুক্তিযোদ্ধা ও ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনার পাশাপাশি তিনি মধ্যনগর থানার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামের ছাত্র, যুব ও সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের জন্যে সংগঠিত করেন এবং শত শত মণ ধান, চাল সহ অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী ক্যাম্পে সরবরাহের ব্যবস্থা করেন যা কিনা যুদ্ধের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রসদ।জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন মেহের আলী বঙ্গবন্ধুর সাথে একই মঞ্চে বহুবার বক্তব্য প্রদান করেছেন। মেহের আলী নিহত হওয়ার পর মহষেখলা ক্যাম্পের পরিস্থিতি অ্যতন্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই  মহেষখলাতে জয় বাংলা বাহিনীর নেত্রকোনা শাখার প্রধান,কোম্পানী কমান্ডার,জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি,সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ-৭১, নেত্রকোণা জেলা- সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা  মো: শামছুজ্জোহা ও জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আমীরুল ইসলামকেও আততায়ীরা গ্রেফতার করে হত্যা করার জন্য কিন্ত সৌভাগ্যক্রমে তারা বেচে যায়। এই আততায়ীদরে বিরুদ্ধে বহু নিরপরাধ মানুষকে হত্যা,নর্যিাতন,র্ধষন ও লুটরে অভিযোগ ছিল। 

উল্লেখ্য যে,মুক্তিযুদ্ধের খরচ ও যুদ্ধ পরিচালনার জন্যে জাতীয় প্রয়োজনে বীরমুক্তিযোদ্ধা মো: শামসুজ্জোহার নেতৃত্তে বীরমুক্তিযোদ্ধা  বুলবুল ইপিআর সদস্যসহ অন্যান্যদরকে নিয়ে পুলিশের অস্ত্রাগার ও নেত্রকোণার ন্যাশনাল ব্যাংকের Volt ভেঙ্গে টাকা পয়সা , সোনা  লুট করেন যে ঘটনাটি জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে। নেত্রকোণাবাসী শহীদ মেহের আলীর হত্যাকারীদের ক্ষমা করেননি। স্বাধীনতা লাভের অল্প কয়েকদিন পর তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম এরশাদুর রহমানের নেতৃত্বে সেইসব ঘাতকদের জনসম্মুখে হত্যা করা হয়েছিলো। জনাব খালেকদাদ চৌধুরী অত্যন্ত  দক্ষতার সাথে সর্ব জনাব ডাঃ আখলাক হোসেন এম.পি, কে.এম ফজলুল কাদের এডভোকেট, খালেকদাদ চৌধুরী, মারাজ মিয়া চেয়ারম্যান, আব্দুল কদ্দুছ আজাদ, নুরুজ্জামান চিশতী,ইনসান উদ্দিন খান ও ডাঃ জগদীশ দত্তদের  নিয়ে মহিষখলা ক্যাম্পের যাবতীয় কর্মকান্ড অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালনা করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহের আলীকে হত্যা এবং বীরমুক্তিযোদ্ধা  মো: শামছুজ্জোহা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আমীরুল ইসলামকে হত্যা করার জন্য গ্রেফতারের  পর উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি নেতৃস্থানীয় ভুমিকা পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে জনাব খালেকদাদ চৌধুরীর অবদান জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে।

জীবনাবসান:
১৯৮৫ খ্রীস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম  সংগঠক  ও  বরেণ্য সাহিত্যিক বীর মুক্তিযোদ্ধা  খালেকদাদ চৌধুরীর জীবনাবসান ঘটে। তার মৃত্যুর পর প্রাবন্ধিক আবু জাফর শামসুদ্দিন এক নিবন্ধে লিখেন, "... সেকালের তরুণ মুসলিম সমাজে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন পূর্ণিমার চাঁদ। তাঁকে ঘিরে অসংখ্য তারকা জ্বলছিল, যার যতটুকু ক্ষমতা সেই মতো আলো বিকিরণ করছিল। একে একে সবাই বিদায় নিচ্ছেন। খালেকদাদ চৌধুরীর পরলোক গমনের সঙ্গে সঙ্গে শেষ তারকাটি খসে পড়লো।’ তার শেষ রচনা একটি ছোটগল্প যার শিরোনাম "আবর্ত"।

পুরষ্কার ও সম্মাননা: 
১৯৮৩ সালে  মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম  সংগঠক  ও  বরেণ্য সাহিত্যিক বীর মুক্তিযোদ্ধা  খালেকদাদ চৌধুরীকে বাংলা একাডেমী সাহিত্য (১৯৮৩) ও একুশে পদক(২০২২)  দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য   ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ ও লোকসাহিত্য গবেষণা একাডেমি সম্মাননা স্মারক ২০২২ প্রদান করা হয়। ষাটের দশকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য “Bangladesh Muktijudho Research Institute Silver Award-2023” সম্মাননা প্রদানের জন্যে মনোনীত করা হয়। তার স্মৃতি রক্ষায় নেত্রকোণা সাহিত্যসমাজ ১৯৯৭ সালে খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করে। বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক জাতীয় ব্যক্তিত্বকে  খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: ২০১৮ সালে একুশে পদক প্রদান" সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ২৬ এপ্রিল ২০২০।

আরও পড়ুন: বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী


Notice: Undefined variable: sAddThis in /home/durjoyba/public_html/details.php on line 808