সোমবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

মুক্তাগাছায় পৌণে ২ কোটি টাকার ৩২৯ টন চাল পায়নি তদন্ত কমিটি : প্রকাশ্যে এলো দুর্নীতি 

প্রকাশিত: ২১:১৬, ২৩ নভেম্বর ২০২৩

আপডেট: ২১:১৭, ২৩ নভেম্বর ২০২৩

মুক্তাগাছায় পৌণে ২ কোটি টাকার ৩২৯ টন চাল পায়নি তদন্ত কমিটি : প্রকাশ্যে এলো দুর্নীতি 

মুক্তাগাছা খাদ্য গুদাম

ময়মনসিংহের আলোচিত মুক্তাগাছা খাদ্য গুদামে ৩২৮ টন ৯৮০ কেজি চাল পায়নি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি। প্রকাশ্যে এলো দুর্নীতি। সরকারের অর্থনৈতিক মূল্য অনুযায়ী উল্লেখিত চালের দাম ১ কোটি ৭০ লাখ ৭২ হাজার ২৮২ টাকা। গুদাম পরিমাপের সময় পাওয়া যায়নি ৮৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল্যের ৩০ কেজির ১৪৯৫টি ও ৩০ হাজার ৪০০ টাকা মূল্যের ৫০ কেজির ৩৮০টি খালি বস্তা। 

বুধবার বিষয়টি জানাজানি হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রেবেকা সুলতানা রুবী কঠোর গোপনীয়তায় মঙ্গলবার বিকালে মুক্তাগাছা থানায় মামলা দায়ের করেন। মঙ্গলবার গোপন থাকলেও বুধবার মামলা দায়েরের খবর ছড়িয়ে পড়ে। মামলায় আসামি করা হয়েছে পালিয়ে যাওয়া খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাকিল আহমেদকে। অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করে সরকারি সম্পদ আত্মসাত করার ৪০৯ ধারায় দায়ের করা মামলাটি দুদক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। আলোচিত মামলাটি আপাতত মুক্তাগাছা শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মোঃ শফিকুল ইসলাম তদন্ত করছেন। 

গত মাসের শেষ দিকে ধরা পড়ে মুক্তাগাছা খাদ্য গুদামের চাল আত্মসাতের ঘটনা। ২০১৯ সালেও ঘটে একই ঘটনা। ৫০০ টন চাল কেলেঙ্কারী নিয়ে তোলপাড় হয়েছিলো। নিম্নমানের পুরাতন চাল কিনে মজুদ, মিল মালিকদের সাথে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তখন ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়। ওই ঘটনার বিচার না হওয়ায় এবং দুর্নীতিবাজদের লাগাম না টানার কারণে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। গুদামে চালের মজুদ না দেখেই বিল প্রদান করে সরকারি টাকা আত্মসাতের সহযোগিতা করা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রেবেকা সুলতানা রুবী বুধবার পর্যন্ত বহাল তবিয়তে ছিলেন। কর্তৃপক্ষ তাকে দিয়েই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করান। মুক্তাগাছার এ ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না গুদামের অন্যান্য স্টাফ, ময়মনসিংহের কারিগরী খাদ্য পরিদর্শক, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক। তাদের বিরুদ্ধেও পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে খাদ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানা যায়, মুক্তাগাছা থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে ত্রুটি রয়েছে। মামলা রেকর্ডের আগে ২ বার এজাহার পাল্টানো হয়। চাল ও খালি বস্তা আত্মসাতের তারিখ দেখানো হয়েছে ০৯-০৩-২০২১ থেকে ১৭-১০-২০২৩ তারিখ সন্ধ্যার মধ্যে যেকোনো সময়। গুদামের মজুদ অনুযায়ী ২ মাস আগে শেষ হওয়া বোরো চাল আত্মসাত করা হয়। আত্মসাতের ঘটনা দেখানো হয় ২ বছর ৭ মাসের যেকোনো সময়। অথচ গুদামে পুরাতন কোনো চাল মজুদ ছিলো না। শাকিলের যোগদান থেকে পালিয়ে যাওয়ার তারিখ পর্যন্ত আত্মসাত দেখানো হাস্যকর এবং আইনের ফাঁক-ফোকর তৈরী করা ছাড়া আর কিছুই নয়। অপরদিকে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি অদৃশ্য কারণে কঠোর গোপনীয়তায় দীর্ঘ ২৭ দিন গুদামের চাল পরিমাপ করে। রহস্যজনক কারণে তারা কর্তৃপক্ষের দোহাই দিয়ে সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলেন। রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরও কেউ মুখ খুলছেন না। কঠোর গোপনীয়তার কারণে নানান প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। গৌরীপুরের উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম কমিটির প্রধান ছিলেন। ত্রিশালের উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইলিয়াস আহমেদ, ফুলপুরের উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আতিকুর রহমান, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসের উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (কারিগরী) নুসরাত বিনতে আনিস ও খাদ্য পরিদর্শক মোঃ শিব্বির আহাম্মদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। তদন্ত কমিটির প্রধানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। ২৪-০৮-২০২০ থেকে ০২-১০-২০২২ তারিখ পর্যন্ত তিনি মুক্তাগাছা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন। দুর্নীতিবাজ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাকিল আহমেদ ১ বছর ৭ মাস তার অধীনে চাকরি করেন। তখনই তিনি অতিমাত্রায় দুর্নীতিতে জড়ান।

সূত্র জানায়, মুক্তাগাছা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাকিল আহমেদ চাবি নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ১৪ দিনের মাথায় ২৫ অক্টোবর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রোমানা রিয়াজ গুদামের তালা ভেঙে দিলে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি চাল পরিমাপ শুরু করে। ২৭ দিনের মাথায় রবিবার গুদামের চাল পরিমাপ ও গুণগত মান যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়। আত্মসাতের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার প্রাণান্ত অপচেষ্টা চালানো হয়। সূত্র মতে, ২ নম্বর গুদামের ১২টি খামাল ও পেসেজে (করিডোর) থাকা চালের পরিমাপ ৭ নভেম্বর শেষ হয়। পরদিন শুরু হয় ১ নম্বর গুদামের চাল পরিমাপ। রবিবার ১ নম্বর গুদামের ১২টি খামাল ও পেসেজের (করিডোর) চাল পরিমাপের কাজ শেষ হয়েছে। সোমবার নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে গুদামের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কমিটি কঠোর গোপনীয়তায় সোমবার রাতে কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। কয়েক টন নিম্নমানের চাল পাওয়া গেলেও কমিটি রিপোর্টে উল্লেখ করেনি। ২ গুদামের ২৪টি খামালের মধ্যে কয়েকটি খামালের মাঝামাঝি খাড়া করে বস্তা রেখে মজুদ সঠিক থাকার অভিনব কায়দা করা হয়েছিলো। মজুদ অনুযায়ী ২ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার মুক্তাগাছা খাদ্য গুদামে ৩ হাজার ৩৭৯ টন চাল থাকার কথা ছিলো। ২ মাস আগে শেষ হওয়া বোরো সংগ্রহ মৌসুমে মুক্তাগাছা খাদ্য গুদামে ১৫ হাজার ৪৭২.৮৩০ টন চাল সংগ্রহ করা হয়। মূল বরাদ্দ ১৩ হাজার ৮৪৭.৯১০ ও অতিরিক্ত বরাদ্দ ১ হাজার ৬২৪.৯২০ টন। ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত বরাদ্দের ৩০০ টন চাল সরবরাহ না নিয়েই মিল মালিক ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের যোগসাজশে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাকিল বিল উত্তোলন করান। একই সময় অন্য যেকোনো মিলারের কাছ থেকে ২৯ টন চাল সরবরাহ না নিয়েই বিল উত্তোলন করানো হয়।

জানা যায়, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেও ময়মনসিংহের আলোচিত মুক্তাগাছা খাদ্য গুদামে ৫০০ টন চাল কেলেঙ্কারীর ঘটনা ঘটে। মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু হলে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্ণেলিউস চিসিম ঝামেলা মিটিয়ে ফেলেন। ১৮০ টন নিম্নমানের চাল কিনে মজুদ, অতিরিক্ত বরাদ্দের কথা বলে মিল মালিকদের কাছ থেকে ২০০ টন চাল সংগ্রহ ও কম দামে ডিও’র ১২০ টন চাল কিনে মজুদ পুর্ণ করেন। প্রতারণার শিকার মিলারদের চালের বিল না দেওয়ায় সালিস হয়। কর্ণেল স্ট্যাম্পে লিখিত ও চেক প্রদান করেন। টাকা পরিশোধ না করায় বিসমিল্লাহ অটো রাইস মিলের মালিক মোঃ শুকুর আলী ও রাহাত অটো রাইস মিল-১ ও ২ এর মালিক মোঃ আব্দুস সাত্তার কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ এবং চেক ডিজঅনার করিয়ে আদালতে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া করেন। কর্ণেল টাকা পরিশোধ করে মামলা থেকে রক্ষা পান। তিনি ১৭-১১-২০১৬ থেকে ১৯-০২-২০১৯ তারিখ পর্যন্ত মুক্তাগাছায় কর্মরত ছিলেন। ৭ মাস অন্যত্র থাকার পর ০৬-০৯-২০১৯ তারিখে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া খাদ্য গুদামে যোগদান করেন। বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন করে ৩ বছর ২ মাস দুপচাঁচিয়া অবস্থানের মাথায় ২০২২ সালের অক্টোবর মাসের শেষ দিকে কর্ণেল হঠাৎ অসুস্থ হন। কর্তৃপক্ষ গুদাম সিলগালা করে কমিটি দিয়ে পরিমাপ করান। ১১০ টন বোরো চাল কম থাকার ঘটনা ধরা পড়লে ভিন্ন কায়দায় বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা হয়। কমিটি ০৭-১১-২০২২ তারিখে মোঃ শফিউল ইসলামকে গুদামের দায়িত্ব দেয়। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় যোগদানের আগে কর্ণেল নরসিংদীর রায়পুরা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় সেখানেও ১০০ টন চাল ও বিপুল পরিমাণের খালি বস্তা কম পাওয়া যায়। এ নিয়ে চলে তোলপাড়। এক পরিবহন ঠিকাদারের সহযোগিতায় সে যাত্রায় তিনি রক্ষা পান। ঠিকাদারের টাকা পরিশোধ করেন নি কর্ণেল। শেরপুরে বাড়ি ওই ঠিকাদার পাওনা টাকার জন্য কয়েকবার মুক্তাগাছায় হানা দেন। সূত্র মতে, কর্ণেলিউস চিসিম মুক্তাগাছায় কর্মরত থাকার সময় মুসলমানদের দাড়ি নিয়ে ফেসবুকে বিরূপ মন্তব্য করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে বেকায়দায় পড়েন। খাদ্য অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখা তাকে কৈফিয়ত তলব করে। মদ খাওয়া নিয়েও ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তিনি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন।

মুক্তাগাছা খাদ্য গুদামে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রেবেকা সুলতানা রুবী জড়িত বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। তার যোগসাজশেই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাকিল লাগামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি করেন। রুবী তার স্বামী খাদ্য অধিদপ্তরের সিস্টেম এনালিষ্টকে দিয়ে তদবির করিয়ে ০২-১০-২০২২ তারিখে মুক্তাগাছায় যোগদান করেন। এর আগে ময়মনসিংহের ত্রিশালে কর্মরত ছিলেন। গুদামে চালের মজুদ নিশ্চিত না হয়েই বিল প্রদান করে তিনি বখরা আদায় করেন। অন্যদিকে মুক্তাগাছার সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন সিন্ডিকেট প্রধান মোঃ আব্দুল হালিম। তার মালিকানায় ‘হালিম রাইস এন্ড ফ্লাওয়ার মিল’ থাকলেও শাসন করেন ২৫টি রাইস মিল। নিয়ন্ত্রণ করেন মুক্তাগাছা খাদ্য গুদামের সকল কর্মকাণ্ড। কাবিখা, ভিজিডি, ভিজিএফ, খাদ্য বান্ধব, ওএমএস এবং রেশনের সকল চাল তার মাধ্যমে বিতরণ করতে হয়। 

গুদাম থেকে চাল বিতরণ দেখিয়ে আবারো তা মজুদ করে বোরো ও আমন সংগ্রহ দেখানোর পর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। গুদামের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা ও প্রযুক্তির সহযোগিতা নিলেই অনেক প্রমাণ এবং তথ্য পাওয়া যাবে। সংযুক্ত থাকা সহকারী উপ খাদ্য পরিদর্শক তুহিন গুদামের মজুদ থেকে শুরু করে সব কিছুর দেখভাল করতেন। শাকিল তার ওপর শতভাগ নির্ভর করতেন। মিলারদের কাছ থেকে চাল রিসিভ, বিল প্রস্তুত, ডিও ডেলিভারী সব কিছুই হতো তুহিনের হাত দিয়ে। এ সুযোগে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। শাকিল পালানোর আগেই তুহিন বিষয়টি বুঝতে পারেন। তড়িঘড়ি মূল কর্মস্থল ময়মনসিংহ সিএসডিতে ফেরত আসেন। মোটা অংক দিয়ে খাদ্য অধিদপ্তরে তদবির করে টাঙ্গাইলে বদলি হন। পোস্টিং নেন বাড়ির কাছের ধনবাড়ি খাদ্য গুদামে। ধুরন্ধর তুহিন বন্ধ রেখেছেন মোবাইল ফোন। তার গ্রামের বাড়ি মধুপুরে। অজপাড়াগাঁওয়ের কৃষক পরিবারের সন্তান তুহিন অনিয়ম, দুর্নীতি ও আত্মসাতের টাকায় বাড়িতে নির্মাণ করছেন বহুতল ভবন।

আরও পড়ুন: গফরগাঁওয়ে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগ

শিবলী সাদিক খান


Notice: Undefined variable: sAddThis in /home/durjoyba/public_html/details.php on line 808