সোমবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

গৌরীপুরে বিজয়কান্তের জমিদারবাড়িটি

মৈমনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্র কুমার দে’র স্মৃতি-নিদর্শন

প্রকাশিত: ০৯:৩৯, ২৪ নভেম্বর ২০২৩

মৈমনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্র কুমার দে’র স্মৃতি-নিদর্শন

গৌরীপুরে বিজয়কান্তের জমিদারবাড়িটি ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র সংগ্রাহক চন্দ্র কুমার দে’র স্মৃতি-নিদর্শন

২৪ নভেম্বর, ২০২৩ (বাংলা ভার্সনে) ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’ প্রকাশের শত বছর। ঠিক ১০০ বছর আগে, ১৯২৩-এর মার্চ মাসে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালকাটার ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ‘Eastern Bengal Ballads – Mymensing (vol. 1, part-1)’, যা আদতে ইংরেজি ভার্সনে দশটি ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ এর তরজমা। ড. দীনেশ চন্দ্র সেন এই অনুবাদ করেছিলেন।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রচলিত পালা গানগুলোকে একত্রে মৈমনসিংহ গীতিকা বলা হয়। মৈমনসিংহ গীতিকা বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ সম্পদ। চন্দ্র কুমার দে-র মতো নিবেদিতপ্রাণ সংগ্রাহক না থাকলে এগুলো হয়তো হারিয়ে যেতো বাংলার পথে প্রান্তরে। ভাগ্যক্রমে সেটা হয়নি। এই গানগুলো প্রাচীন কাল থেকে মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত হয়ে আসছে। তবে ১৯২৩-৩২ সালে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন এই গানগুলো সম্পাদনা করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রকাশ করেন। এই গীতিকাটি বিশ্বের ২৩টি ভাষায় মুদ্রিত হয়।

গৌরীপুরে ১২টি জমিদারবাড়ি মধ্যে একটি জমিদারবাড়িতে চাকরি করতেন চন্দ্র কুমার দে। কোন জমিদারবাড়িতে চাকরি করতেন তা জানা যায়নি। এই জমিদারবাড়ির অধীনে এক সময় চাকরি করতেন মৈমনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্র কুমার দে। সেই স্মৃতি আঁকড়ে গৌরীপুরের কালীপুর বড় তরফ এস্টেটের জমিদার বিজয়কান্ত লাহিড়ীর বাড়ি এখন যেন ২নং ইউনিয়নের ভূমি অফিস। অবহেলায়  অনেক সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে চন্দ্র কুমার দে’র স্মৃতি বিজড়িত বিজয়কান্ত লাহিড়ীর বাড়িটি। অথচ এই কাছারি বাড়িটি এক সময় গমগম করত প্রাণপ্রাচুর্যে। মেরামতের অভাবে লাহিড়ী পরিবারের সাজানো গোছানো স্মৃতি চিহ্নগুলো দিনে দিনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সেই গৌরবের ইতিহাসে এখন অনেক জায়গা বেদখল এবং কিছু জায়গা অবহেলায় পড়ে আছে।

গৌরীপুর থানার উত্তর পাশে এগোলেই বিজয়কান্ত লাহিড়ীর বাড়িটি চোখে পড়বে। এই বাড়ির সঙ্গেই জড়িয়ে বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, যা এখন ঢাকা পড়ে গিয়েছে বিস্মৃতির ধুলোয়। বিশেষ করে জমিদার বাড়িটির অজানা ইতিহাস ও বেহালদশার কারণে নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের কাছে মৈমনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্র কুমার দে’র স্মৃতি-নিদর্শন বিজয়কান্তের জমিদারবাড়িটির ইতিহাস ঐতিহ্য অজানাই থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মৈমনসিংহ-গীতিকা প্রকাশের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে গৌরীপুর উপজেলায় মৈমনসিংহ গীতিকা সংগ্রাহক চন্দ্র কুমার দে’র স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জমিদার বিজয়কান্ত লাহিড়ীর বাড়িসহ পতিত জায়গাটি অধিগ্রহণ করে চন্দ্র কুমার দে সংস্কৃতিক ও প্রত্ন বিষয়ক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন, এসিক এসোসিয়েশন, দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাফেয়ার্স সহ সচেতন নাগরিক সমাজ দাবি জানায়। ফলে এক সময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ঐতিহাসিক নিদর্শন এই বাড়িটি দেখার জন্য  খুব বেশি বেশি পর্যটক আসবে।

লোকসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ সংগ্রাহক ১৮৮৯ সালে ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার আইথর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রাম কুমার দে। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান চন্দ্র কুমার দে। পড়ালেখা বলতে গ্রামের পাঠশালায় যেটুকু পড়ালেখা হয় ততটুকুই। কর্মজীবনের প্রথমে তিনি একটি মুদি দোকানে মাসপ্রতি এক টাকার বেতনে চাকরি নেন। কাজের প্রতি মনোযোগ না থাকায় তার এক টাকা বেতনের চাকরিটি চলে যায়। পরবর্তীতে তারানাথ তালুকদার মাস প্রতি ২ টাকার বেতনে তাকে কর আদায় সম্পর্কিত কাজে নিজুক্ত করেন।

এ বিষয়ে ড. দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন, ‘চন্দ্রকুমার জীবনে কতটা দুঃখ, দারিদ্র্য ও দৈন্যের সঙ্গে সংগ্রাম করিয়া সাহিত্যচর্চ্চা করিতেছেন তাহা শুনিলে কষ্ট হয়। নিম্নে তাঁহার জীবন সম্বন্ধে দুই একটি-কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করিতেছি। চন্দ্রকুমার ১৮৮৯ খৃ: অব্দে মৈমনসিংহে নেত্রকোণার অন্তর্গত আইথর নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি গ্রাম্য পাঠশালায় সামান্যরূপ শিক্ষালাভ করিয়া এক টাকা মাসিক বেতনে মুদিখানায় কাজ করিতেন। অনুপযুক্ত ও অমনোযোগী বলিয়া তাঁহার সেই কাজ যায়। তাহার পরে দুই টাকা মাহিনায় তিনি একটি গ্রাম্য তহশিলদারী যোগাড় করেন। এই সূত্রে তাঁহার চাষাদের সঙ্গে অবাধভাবে মিশিবার সুযোগ হয়। চাষারা যখন তন্ময় হইয়া এই সব পালা গাইত, চন্দ্রকুমারও তাহাদের সঙ্গে তন্ময় হইয়া তাহা শুনিতেন।’

আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত অংশুমান ভৌমিকের ফিচারের শিরোনাম ‘অবিভক্ত বাংলার উদার জীবনের প্রতিফলন ফুটে উঠেছিল মৈমনসিংহ-গীতিকায়’ লেখাটির মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূণ তথ্য পাওয়া গেছে। ‘‘১৩১৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে, কেদারনাথ মজুমদারের সম্পাদনায় বেরোতে শুরু করে ‘সৌরভ’। ‘সৌরভ’-এর ১৩২০ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন সংখ্যায় ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ নামে একটি রচনা ছাপা হয়। লেখক চন্দ্রকুমার দে। বয়স ২৩ বৎসর।’’

কেদারনাথ ‘সৌরভ’-এর দপ্তরে ডেকে পাঠালেন চন্দ্রকুমারকে। শুনলেন কত কায়ক্লেশে দিন চলে তাঁর। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের কালীপুর এস্টেটের জমিদার বিজয়কান্ত লাহিড়ীকে বলে আট টাকা মাইনের তহশিল আদায়ের চাকরির বন্দোবস্ত করলেন চন্দ্র কুমারের জন্য। তাতে কী? হিসাবের খাতা ভরাট হতে থাকল খেতে খামারে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা গায়েনদের উপাখ্যানমালায়। কর্তব্যে গাফিলতির জেরে এই চাকরিও গেল তাঁর।’’

এই চাকরি সূত্রে তাকে নানা জায়গায় ঘুরতে হতো। ফলে, কৃষকদের সাথে অবাধ মেলামেশার একটা সুযোগ তৈরি হয়। যার ফলে গ্রাম্য চাষাদের মুখে মুখে ফেরা নানা পালা গানের সন্ধান তিনি পেয়ে যান।

রাইজিংবিডি অনলাইনে প্রকাশিত সঞ্জয় সরকার এর ফিচারের শিরোনাম ‘‘হারিয়ে গেছে চন্দ্রকুমার দে’র স্মৃতি-নিদর্শন’’ লেখাটির মধ্যেও গৌরীপুরের জমিদারবাড়িসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূণ তথ্য যুক্ত করা হয়েছে। যেমন, ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত ময়মনসিংহের ‘সৌরভ’ পত্রিকায় ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এটি লিখেছিলেন চন্দ্র কুমার দে। এর পর থেকেই কেদারনাথ মজুমদারের উৎসাহে ওই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে থাকেন তিনি। কেদারনাথ মজুমদারের সহযোগিতাতেই গৌরীপুরের কালীপুর এস্টেটের জমিদার বিজয় কান্ত লাহিড়ীর অধীনে মাসিক আট টাকা বেতনে তহশিলদারের চাকরি হয় তার। চাকরির সুযোগে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ আরও বেড়ে যায় তার। কিন্তু গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে তহশিলের বদলে তিনি লিখে আনতে লাগলেন পল্লীর গায়েনদের গাওয়া উপাখ্যান। ফলে এই চাকরিটিও তাকে হারাতে হয়। ততদিনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দীনেশচন্দ্র সেন তার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তিনি ‘সৌরভ’ পত্রিকায় চন্দ্রকুমার দে’র লেখা নিয়মিত পড়তেন। ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে মাসিক ৭০ টাকা বেতনে পালাগান সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করেন। এতে তার আর্থিক অনটন যেমন দূর হয়, তেমনি মনের মতো কাজ পেয়ে খুশিও হন।

চন্দ্রকুমার দে ৫৭ বছর বেঁচে ছিলেন। এ সময় তিনি শুধু মৈমনসিংহ গীতিকার গানই নয়, পূর্ববঙ্গ গীতিকার চার খণ্ডে যে ৫৪টি পালা মূদ্রিত হয়েছে সেগুলোর অন্তত ২৫টির সংগ্রাহক ছিলেন।

প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, ‘‘চন্দ্র কুমার দে’র একমাত্র স্মৃতি ময়মনসিংহের পৌর শ্মশাণঘাটে একটি মঠ ছিল। তাও একাত্তরে পাকসেনা ও এদেশীয় দোসরেরা গুড়িয়ে দেয়।’’

লোকায়ত সাহিত্যের এই অগ্রজের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার আইথর গ্রামে। তিনি সরকারি উদ্যেগে আইথর গ্রামের বাড়িটি বর্তমান মালিকের কাছ থেকে ফিরিয়ে এনে সংরক্ষণের দাবি জানান।

পালা নাট্যকার রাখাল বিশ্বাস বলেন, ‘‘কেদারনাথ মজুমদারের সহযোগীতাতেই এবং কেদারনাথের পরম আত্মীয় কৃষ্ণকুমারের সুপারিশে গৌরীপুরের কালীপুর এস্টেটের জমিদার বিজয়কান্ত লাহিড়ীর অধীনে মাসিক ৮ টাকা বেতনে তহসিলদারের চাকরি হয় চন্দ্রকুমারের। এই চাকরির সুবাদে গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ বৃদ্ধি পায়। ফলে তহসিলদারির কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে লিখে আনতে থাকেন পল্লীগ্রামের গায়েনদের গাওয়া বিভিন্ন লোকগাঁথা উপাখ্যান। এসব কারণে একদিন এ চাকরিও হারাতে হয়। এতে অর্থকষ্ট দেখা দিলেও তিনি হতাশ হননি। বরং আরও বেগবান হয় সংগ্রহের কাজ। থেমে যায়নি সৌরভ পত্রিকায় লেখা-লেখিও।’’

এখনও দু’এক জন বৃদ্ধ জীবিত আছেন যারা ময়মনসিংহের গৌরীপুরের কালীপুর এস্টেটের জমিদার বিজয়কান্ত লাহিড়ীর বাড়ি চেনেন। ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাফেয়ার্স-এর যৌথ উদ্যোগে মোমেনসিং ও জাফরশাহী পরগনার প্রাচীন নিদর্শন খোঁজার জন্য ২০২০ হতে জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমান প্রজন্ম জমিদারির সঠিক ইতিহাস কেউ জানে না। ২০২৩ সালে গৌরীপুরের কালীপুর এস্টেটের বড়তরফ জমিদার এলাকায় জরিপের সময় এলাকার কয়েকজন বাসিন্দাসহ প্রবীন ব্যক্তিদের সঙ্গে  বড়তরফের তিনটি হিস্যার জমিদারি বিষয়ে কথা হয়। পুরাতন জেলাখানা মোড়ের বাসিন্দা মোঃ মমতাজ উদ্দিন (৮৫) এর মাধ্যমে স্থানসহ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এই জরিপের ভিত্তিতে "কালীপুরের ইতিহাস (পর্ব-২): কালীপুর বড়তরফ জমিদারবাড়ির ইতিকথা" শিরোনামে প্রকাশিত হলে জমিদার বিজয়কান্ত লাহিড়ীর বাড়ির তথ্য পাওয়া যায়। এই ফিচারের মাধ্যমে দুই একটি-কথা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো-

কালীপুর বড়তরফের একটি হিস্যার জমিদার  বিজয়কান্ত লাহিড়ীর পিতা অভয়াকান্ত  লাহিড়ী ইংরেজি ১৮৪০ সালের জানুয়ারি মাসে অর্থাৎ বাংলা ১২৪৬ সালের ২৯ মাঘ মাসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি অতিশয় বলিষ্ঠ ও তেজস্বী পুরুষ ছিলেন। রামগোপালপুরের জমিদার শ্রী শৌরীন্দ্র্রকিশোর রায় চৌধুরীর উদ্ধৃতি থেকে জানা যায় যে, “সরলতা উদারতা তাহার চরিত্রের প্রধান ভূষণ ছিল। বীরোচিত ক্রীড়ায়, অশ্বারোহণে, মল্লযুদ্ধে, ব্যাঘ্রশিকারে, অভয়াকান্ত বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। শারীরিক বলের জন্য তিনি সর্বত্র পরিচিত ছিলেন। সঙ্গীতশাস্ত্রে তাহার অনুরাগ ছিল। বেহালা বাদনে তিনি পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন। অভয়াকান্ত প্রথমত ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত পল্লীগ্রামের কালীসুন্দরী দেবীকে বিবাহ করেন। কিন্তু তাহার গর্ভজাত কোন সন্তান জীবিত না থাকায় নদীয়া জেলার অন্তর্গত কৃষ্ণনগর নিবাসী দীনবন্ধু চৌধুরির কন্যা স্বর্ণলতা দেবীর পাণিগ্রহণ করেন। এই দ্বিতীয় বিবাহের ফলে এক পুত্র ও তিন কন্যা জন্মে। দুই কন্যা অভয়াকান্তের জীবিতাবস্থাতেই কালগ্রাসে পতিতা হন।” স্বর্ণলতা দেবী তার স্বামী , ছেলে  ও মেয়ে কে রেখে ইংরেজি ১৮৯০ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন। এটা ছিল একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা।

স্ত্রীর মৃত্যু শোকে বাংলা ১২৯৯ (ইংরেজি ১৮৯৩) সালের ২৮ আশ্বিন মাসে তিনিও পরলোক গমন করেন। এতিম (পিতৃমাতৃহীন) অসহায় ছেলে বিজয়কান্ত ও মেয়ে হেমলতা দেবী কালীপুর ছোট তরফের জমিদার ধরণীকান্ত লাহিড়ি চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে বড় হতে লাগলেন। হেমলতা দেবী ফরিদপুরের অন্তর্গত বালিয়াকান্ধি গ্রাম নিবাসী রাজেন্দ্রলাল মৈত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। বিজয়াকান্ত লাহিড়ি  প্রভাবতী দেবীকে বিয়ে করেন।  প্রভাবতী দেবী দুই মেয়ে রেখ ১৩১৪ সালের ২৯ বৈশাখে অকালে পরলোকগমন করেন। বিজয়াকান্ত বাংলা ১৩১৫ সালে জমিদারি  গ্রহণ করেন। ১৯১১ সাল হতে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সন্ধান সঠিকভাবে জানা যায়নি। প্রভাবতী দেবীর মৃত্যুর পর বিজয়কান্তের জীবদ্দশায় দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল কি-না অথবা দত্তক নিয়েছিলেন কি না, তা সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি। তবে ঢাকা গেজেট, ১৯/০২/১৯৫৫ ইং প্রকাশনার এবং প্রজ্ঞাপন নং ১৭৬৮ এল আর (২৭/০১/১৯৫৫ইং) সূত্র থেকে নৃপেন্দ্রকান্ত লাহিড়ি নামে জমিদারের নাম পাওয়া যায়। নৃপেন্দ্রকান্ত লাহিড়ির সাথে ‘গং’ যুক্ত রয়েছে।  ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় বিজয়াকান্তের পরিবার ভারতে চলে যান। বিজয়াকান্তের জমিদারবাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের ২নং গৌরীপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস, বিআরডিবি অফিস, পুরাতন মন্দিরের দক্ষিণের বাড়িঘর কোয়ার্টার বা লিজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পুরাতন জেলাখানা মোড়ের বাসিন্দা মোঃ মমতাজ উদ্দিন (৮৫)বলেন, জমিদার  বিজয়কান্ত লাহিড়ীর ছেলে অনিলকান্ত লাহিড়ী যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে পাকিস্তান আমলে কালীপুর জমিদার বাড়িতে ( ২নং গৌরীপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে) পরলোকগমন করেন। তখন তার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী সকলেই কলকাতায় বসবাস করতেন। তিনি আরও বলেন,অনিলকান্ত লাহিড়ী একজন দক্ষ শিকারী ছিলেন। তিনি বাঘ শিকার করার জন্য মধুপুর জঞ্জল গাড়ো পাহাড়ে চলে যেতেন। তিনি নিজ চোখে দেখেছেন শিকার করে গৌরীপুরে বাঘ নিয়ে আসা। অভয়াকান্ত  লাহিড়ীর উত্তরাধিকার গুণ পেয়েছিলেন  বিজয়কান্ত লাহিড়ীর ছেলে অনিলকান্ত লাহিড়ী। এই সব উদাহরণ থেকে স্পষ্টই উপলদ্ধি হয় যে- 

উল্লেখ্য যে,১৯২৩-এর নভেম্বরের পর খুব দ্রুত আরও তিনটি খণ্ড বেরিয়েছিল ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’-র। শুধু চন্দ্রকুমার দে নন, পরবর্তী কালে এই প্রকল্পের ক্ষেত্রসমীক্ষক হিসেবে জুড়ে গিয়েছিলেন আশুতোষ চৌধুরী, জসীমউদ্দীন, নগেন্দ্রনাথ দে, বিহারীলাল রায়, মনসুরউদ্দীন, মনোরঞ্জন চৌধুরী, শিবরতন মিত্র। তাঁদের সবার খুঁজেপেতে আনা পালার সংখ্যা সাকুল্যে দাঁড়িয়েছিল ৫৪। এর মধ্যে চন্দ্রকুমারের অবদান ছিল আট আনা! তথ্য সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে-

তথ্যসূত্র:
 ১. ময়মনসিংহ গীতিকা-ড. দীনেশচন্দ্র সেন
২. অংশুমান ভৌমিকের ফিচারের শিরোনাম ‘অবিভক্ত বাংলার উদার জীবনের প্রতিফলন ফুটে উঠেছিল মৈমনসিংহ-গীতিকায়’ -(আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত।
৩. ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার— শ্রী শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী (রামগোপালপুর এস্টেট এর জমিদার ও রাজা যোগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর ৩য় পুত্র)  
৪.কালীপুরের ইতিহাস,পর্ব-২ : কালীপুর  বড়মতরফ জমিদারির ইতিকখা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন
৫. উইকিপিডিয়ার উল্লেখিত শিরোনাম থেকে- মৈমনসিংহ গীতিকা - উইকিপিডিয়া।
৬. ময়মনসিংহ গীতিকা- বাংলাপিডিয়া
৭. ম্যাগাজিন: পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২০, পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২১ ও ২০২২
৮. ইতিহাস অনুসন্ধানী সংগঠন কর্তৃক প্রতিবেদন (এসিক এসোসিয়েশন, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন ও দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স )

লেখক: মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার, সাংবাদিক, গবেষক ও ইতিহাস সন্ধানী।

আরও পড়ুন: নেত্রকোণা-৩ আসনে কে হবেন নৌকার মাঝি?


Notice: Undefined variable: sAddThis in /home/durjoyba/public_html/details.php on line 808