সোমবার ০৪ মার্চ ২০২৪, ২১ ফাল্গুন ১৪৩০

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেত্রকোণায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন

প্রকাশিত: ০৭:১৪, ১৩ মে ২০২৩

আপডেট: ০৭:২৬, ১৩ মে ২০২৩

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেত্রকোণায় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী

বাহান্ন-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ-এর মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তান অধ্যুসিত পুর্ব বাংলার বাঙালি জনগণের বীরত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস আমাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না। এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলনের যে গতি সৃষ্টি হয় তা পূর্ববাংলার বাঙালী জনগোষ্ঠীর মনোবল ও সুদৃঢ় আত্ম প্রত্যয়ের সঞ্চার করে। পূর্ব বাংলার বাঙালি জনগোষ্ঠী আপন স্বাতন্ত্র, কৃষ্টি, ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে বাঙালির নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনও গড়ে উঠেছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণগোষ্ঠী রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেত্রকোণাও পিছিয়ে ছিলো না। তৎকালীন সময়ে নেত্রকোণার সাংস্কৃতিক কর্মীরা রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে থাকেন।

নেত্রকোণাও এর থেকে পিছিয়ে ছিলো না। নেত্রকোণা সাহিত্য সাংস্কৃতি অঙ্গনে স্থানীয়ভাবে সিদ্দিক প্রেস থেকে প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরীর সম্পদনায় উত্তর আকাশ নামে একটি সাপ্তাহিক/পাক্ষিক একটি পত্রিকা প্রকাশ হতো। এই পত্রিকাটি স্থানীয়ভাবে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীসহ নেত্রকোণার সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডগুলো চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। যদিও পত্রিকাটি ছিল নেত্রকোণার মৌলিক গণতন্ত্রীদের মুখপত্র। তখন পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল (স্বঘোষিত) আ্ইয়ুব খানের দৌর্দন্ড প্রতাপে শাসন চলিতেছিল। মৌলিক গণতন্ত্র ছিল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান কর্তৃক পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের মূলনীতি। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের প্রচলিত মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে চলছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলন। এই আন্দোলনকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ দিতেই রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

বিশেষ করে পাকিস্তান অধ্যুসিত পূর্ববাংলার বাঙালি জনতাকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় সম্মৃদ্ধ করতে এ ধরনের আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল। এই উত্তর আকাশ পত্রিকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল নেত্রকোণা সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিসহ কবি সাহিত্যিকদের আসর। এই উত্তর আকাশ পত্রিকার সাথে সম্পৃক্ত  ব্যক্তিবর্গ, সকলেই ছিল পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন রাজনীতির বিরুদ্ধে। এই উত্তর আকাশের মাধ্যমে নেত্রকোণায় অনুষ্ঠিত হতো বিভিন্ন সময়ে সাহিত্য সভা, এতে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের নামকরা কবি সাহিত্যিকগণ উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশ নিতেন। এ ছাড়া নেত্রকোণা অঞ্চলের লোক সাহিত্য ও লোক সংস্কৃতির সাথে জড়িত ব্যক্তিগণও উত্তর আকাশ পত্রিকায় লেখা-লেখি করতেন। নেত্রকোণার এই উত্তর আকাশ পত্রিকায় লেখনির মধ্য দিয়ে যাদের হাতেকড়ি তাদের অনেকেই আজকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত কবি, সাহিত্যিক, লেখক। এদের মধ্যে কবি নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, কবি রফিক আজাদ, জীবন চৌধুরী, শান্তিময় বিশ্বাস, কবি আল আজাদ, ছড়াকার সাংবাদিক শ্যামলেন্দু বিকাশ পাল সকলেই আইয়ুব বিরোধী’৬৯ এর ছাত্র গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এ ছাড়া প্রাবন্ধিক অধ্যাপক শামছুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক শফি উদ্দিন আহমেদ, খোরশেদ আলী তালুকদার, রওশন ইজদানী, সিরাজ উদ্দিন কাশিমপুরী, আবু জোহা নুর আহমেদ, আব্দুল হেকিম তালুকদারসহ সম্পাদক খালেকদাদ চৌধুরী। এদের সকলেরই চিন্তা-চেতনা ও লেখার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ সৃষ্টি করে সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছিল শিশু-কিশোর সংগঠন, যেমন আওয়ামীলীগের ছত্রছায়ায় কচি কাঁচার মেলা, ন্যাপের খেলাঘরসহ বেশকিছু আদর্শিক শিশু সংগঠন স্ব স্ব রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দেশী সংস্কৃতির মাধ্যমে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের রাজনৈতিক আন্দোলনকে গতিশীল করে।

 ১৯৬২ সালে কচি কাঁচার মেলা নেত্রকোণায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শিশু কিশোর মেলার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চিন্তা চেতনা সম্বলিত বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে বাংলা ও বাঙালির স্বজাতীয়তাবোধের বিকাশ ঘটানো আন্দোলন শুরু করে। ন্যাপসহ বাম সংগঠনগুলোর সংস্কৃতি কর্মীরা উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর মাধ্যমে গণসঙ্গীত চর্চার মাধ্যমে গণ জাগরণের ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি মানুষে রাজনৈতিক, সংস্কৃতি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে গতীশীল করতে থাকে। পূর্বপাকিস্তানে তৎকালীন সামরিক শাসনের যাতাকলে পড়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের নিষিদ্ধ হয়ে যায় ও পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডও সীমিত হয়ে পড়ে।

১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশত বার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে পূর্বপাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ দীর্ঘদিন পর আবার আলোড়িত হয়ে উঠে। সামরিক শাসনের পর থেকে প্রকাশ্যে সাংগঠনিক রাজনৈতিক কার্যক্রম যখন একেবারে নিষিদ্ধ হয়ে গেলো তখন রাজনীতি আশ্রয় নিলো বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের আড়ালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে সাংস্কৃতিক সাংসদ নামে ছাত্র ইউনিয়নের, ছাত্রলীগের শিল্প সাহিত্য সংঘ, সাংস্কৃতিক পরিষদ ও প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের বুয়েটের ছিল ময়ুখ, ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা করেছিল অগ্রগামী ইত্যাদি সাংস্কৃতিক সংগঠনের আড়ালে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালাতে থাকে।  

 ভারতবর্ষসহ দুনিয়াব্যাপী যখন রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছিলো তখন পূর্বপাকিস্তানের সাংস্কৃতিক কর্মী ও  ছাত্র সমাজ এই রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসে। পাকিস্তানের সামরিক সরকার-এর সরাসরি বিরোধীতা করতে না পারলেও পূর্বপাকিস্তান তৎকালীন সময়ে তথ্যসচিব ও পাকিস্তানপন্থি শিল্পী সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে গঠিত বি.এন.আর (Bureau of National Reconstitution) যার প্রধান ছিলেন মুসা আহমেদ (নাজিম উদ্দিন এর জামাতা) এই মুসা আহমেদ কিছুসংখ্যক ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক নিয়ে বিরোধিতা করতে লাগলেন। ঐ সময়ে পাকিস্তানপন্থি  দৈনিক আজাদ পত্রিকা রবীন্দ্রনাথ জন্মশত বার্ষিকীর বিরোধীতা করে কুৎসিত ভূমিকা পালন করে। ১ বৈশাখ তারিখে আজাদের এক সম্পাদকীয়তে “রবীন্দ্রনাথ ও পূর্বপাকিস্তান”শীর্ষক রচনায় এ ধরণের একটি লেখা বেড়িয়েছিল, লেখাটি এখানে উদ্ধৃত করা হলো- “রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী অনুষ্ঠান মুসলমানদের কাছে (কোহেনদার) ডাকের সমান এবং এই ডাকে সাড়া দিলে তার নিশ্চিত মৃত্যু” এক শ্রেণির ভাড়াটে বুদ্ধিজীবি ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনীতে এ বিষয়ে সভা সেমিনার সিম্পোজিয়াম করে বেড়াতে লাগলেন। ঢাকা জেলা কাউন্সিল বার হলে রবীন্দ্র বর্জনের আলোচনা সভায় অংশ নেন আব্দুল মান্নান তালিব, দেওয়ান আব্দুল হামিদ, মৌলানা মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক গোলাম আযম ও আক্তার ফারুক প্রমুখ।

আলোচনা সভা শেষে গৃহীত এক প্রস্তাবে তারা বলেন “পাকিস্তান ইসলাম ভিত্তিক জাতীয়তা ও রাষ্ট্রকে খন্ডিত করার উদ্দেশ্যে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথকে পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় কবি হিসেবে চালু করার জন্য এক শ্রেণির তথাকথিত সংস্কৃতিসেবী প্রদেশব্যাপী প্রচেষ্টা চালিয়ে যাইতেছে। এই সভা তাদের কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা করিতেছে।” এমন একটা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে বাঙালি জনগোষ্ঠী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মীরা নিরবে মেনে নিতে পারে নাই বিধায়, তারাও সেদিন রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে মফস্বল শহরগুলোতে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্যোগে রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনের কার্যক্রম শুরু করে। সেদিন নেত্রকোণা সর্বস্তরে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্যোগে স্থানীয় দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালিত হয়েছিলো। নেত্রকোণায় অনুষ্ঠিত রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন নেত্রকোণার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক উত্তর আকাশ পত্রিকার সম্পাদক খালেকদাদ চৌধুরী, এতে প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন নেত্রকোণা কলেজের বাংলার অধ্যাপক শফি উদ্দিন আহমেদ, আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন দূর্গেশ পত্রনবীশ, অধ্যাপক শামছুদ্দিন আহমেদ, সত্যকিরণ আদিত্য, জননেতা আব্দুল খালেক, ফজলুর রহমান খান, জামাল উদ্দিন আহমেদসহ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ।

১৯৬১ সালের এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধরাবাহিকতায় ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ সকল রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘটের মাধ্যমে গড়ে উঠা ছাত্র আন্দোলন এর ফলে পাকিস্তানের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল (স্বঘোষিত) আইয়ুব খান সামরিক আইনে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক কর্মকান্ড সীমিত আকারে ঘরোয়া পরিবেশে চালু করতে বাধ্য হয়। সেইসাথে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলগুলোর উপর থেকে বিধি নিষেধ প্রত্যাহার করে নেয়। এমনি করেই তৎকালীন পূর্বাপাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল (স্বঘোষিত) আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরোদ্ধে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে। সেইসাথে ১৯৬২ এর ৩০ জানুয়ারি করাচিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেপ্তারের খবর ৩১ জানুয়ারি ঢাকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে দাবানলের মতো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভ সঞ্চারিত হতে থাকে ছাত্র সমাজের মাঝে। সোহরাওয়ার্দীর গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন শুরু করার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বটতলায় এক ছাত্র সমাবেশ করে ও আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গ্রেফতারের প্রতিবাদে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি আইয়ুব খানের শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট শরীফ কমিশনের গণবিরোধী সুপারিশ পূর্ববাংলার ছাত্র সমাজ প্রত্যাখান করে অত্যন্ত সংগঠিতভাবে ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলে। ১৯৬২ সালে শিক্ষা সমস্যা ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতারের প্রতিবাদে এক বিশাল ও ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল স্তরের ছাত্র-ছাত্রীরা এতে স্বত:ষ্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। 

 ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলার বাঙালিদের মাঝে জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয় আর ৬২ এর ছাত্র আন্দোলন সর্বদলীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের স্ফুরণ ঘটায়। ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি হতে শুরু  হওয়া ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস এক বিরামহীন সংগ্রামের ইতিহাস, আর এই ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়েই ৬৬ এর ছয় দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। যদিও ছাত্র সমাজের এই বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে ছাত্র সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে ছাত্রদের স্বত:ষ্ফুর্ত বিক্ষোভ অনেক প্রবল ছিল। তথাপি উহার গুরুত্ব ছিল যে সামরিক শাসনের যাতাকলে পড়ে পূর্ববাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের যে নিরবতা বিরাজ করছিল ঐ আন্দোলনে তাহা ভাঙ্গিয়া দিয়া গণআন্দোলনের দ্বার খুলিয়া দিয়াছিল। লন্ডনে অবস্থানরত পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের ভিতরেও ঐ আন্দোলন সাড়া জাগাইয়াছিল।  মহান ভাষা আন্দোলনের ধারাকাহিকতায় ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠা ছাত্র গণআন্দোলন তৎকালীন পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসনের বিরোদ্ধে বাঙালি অধ্যুসিত পূর্ববাংলার মানুষকে স্বদেশিকতা, স্বজাত্য বোধ জাগ্রত করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ষাটের দশক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ষাটের দশকের ছাত্র গণ আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে উঠা রাজনৈতিক আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির আলোকে ঐক্যবদ্ধ করে জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে গতিশীল করে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সূচনা করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা দাবী প্রণয়নসহ রাজনৈতিক আন্দোলন ও সুদূর প্রসারী চিন্তা ভাবনা, সেইসাথে ডিপ্লোমেটিক ক্যারিশমা আন্দোলনরত প্রগতীশীল রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয়তাবাদী চেতনা সমন্বয় ঘটিয়ে একই মোহনায় সন্নিবেশিত করে বাঙালি জাতিকে স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।   

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী ,মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন: গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


Notice: Undefined variable: sAddThis in /home/durjoyba/public_html/details.php on line 809