সোমবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০

দুর্জয় বাংলা || Durjoy Bangla

৭ নভেম্বর

সামছুল আলম দুদু এমপি

প্রকাশিত: ২১:০৬, ৭ নভেম্বর ২০২৩

আপডেট: ১৯:২২, ২ ডিসেম্বর ২০২৩

৭ নভেম্বর

সামছুল আলম দুদু এমপি

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঙালি জাতি শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে, অথচ অধিকার আদায়ে ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সুপ্রতিজ্ঞ এ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে যিনি আবির্ভূত হয়েছেন, তিনি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্বিত করেছেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্য কিংবা অভাগা জাতি আমরা। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই এই মহান নেতাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষকে স্বাধীনতার সূর্য উপহার দিয়েছেন যিনি, তিনিই নিহত হন সপরিবারে। 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে একটা জাতিকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়। যারা হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দিয়ে দাম্ভিকতার সঙ্গে বাঙালি জাতিকে ভ্রুকুটি করেছিল, আজ তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল খুবই ঘোলাটে। হতাশাগ্রস্ত ও দিগ্ভ্রান্ত জাতি তার ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছিল। ৩ নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হলে বাঙালি যেন আরো অসহায় হয়ে পড়ে। হত্যা, ক্যুসহ নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জেনারেল জিয়া বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। 

৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো সরকারই ছিল না। সীমাহীন নৈরাজ্যের ভেতর দিয়ে দেশ চলছিল। ৭ নভেম্বর জেনারেল জিয়া অত্যন্ত কৌশলে ক্ষমতার মসনদ দখলে সক্ষম হন। এদিন সেনাবাহিনীর অসংখ্য সদস্যকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীকালে বিচারের নামে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের ফায়ারিং স্কোয়াডে ও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। এই পৈশাচিক কর্মকাণ্ড দেখে বাঙালি জাতি হতবাক হয়ে যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পেছনেও তাদের হাত ছিল।

এখানে উল্লেখ করতে চাই, বাংলাদেশ যেদিন স্বাধীন হয়, সেদিন থেকেই দেশের অবকাঠামো নিয়ে মানুষ চিন্তিত হয়ে পড়ে। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। ভেঙে পড়ে অর্থনৈতিক অবস্থা। পাকিস্তানিদের সীমাহীন নির্যাতনে পঙ্গুত্ব বরণে আমরা বাধ্য হই। এমনি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শাসনভার গ্রহণ করে একটি দেশের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে মনোযোগী হন। সুষ্ঠু ও সুন্দর দেশ গড়ার প্রত্যয়ে তিনি আমাদেরকে একটা সংবিধান উপহার দেন। এত অল্প সময়ে কোনো দেশের সংবিধান রচনার ইতিহাস নেই। তিনি বিশ্বের দরবারে বাঙালি জাতিকে বীর জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে সক্ষম হন। মহান ও উদার মানসিকতা নিয়ে তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতার উষালগ্নেই। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি সুকৌশলে দেশে একটা বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে। ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য একটাই, স্বাধীনতাকে বিপন্ন করা এবং জাতিকে বিপর্যস্ত করে তোলা। তাদের ষড়যন্ত্রের কারণেই ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হন সপরিবারে। বিদেশে অবস্থানের কারণে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেঁচে যান। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তথাকথিত বিপ্লবের নামে দেশকে আরেকটি পাকিস্তান বানানোর চক্রান্ত চলতে থাকে।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতার লাল সূর্যটিকে স্তিমিত করেন। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। পরবর্তীকালে সেনাবাহিনীতে পাকিস্তানি অনুচররা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নামে একটি হ্যান্ডবিল প্রচার করে জাতিকে বিভ্রান্তির জালে আটকে দেয়। জিয়াউর রহমানকে কার্যত গৃহবন্দি করা হয়েছিল। কিন্তু সুচতুর জিয়া সাধারণ সেনাদের কাছে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসেন। কর্নেল তাহের জিয়াকে মুক্ত করেন। জিয়া হিরো বনে যান। এরপর ৭ নভেম্বর একশ্রেণির সেনাবাহিনী রাজপথে নেমে এসে তথাকথিত বিপ্লবের উল্লাস করে। সে উল্লাস ছিল সাধারণ মানুষের কাছে বিষময়। এরপর  স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়। আসলে ৭ নভেম্বর কোনো বিপ্লব ছিল না। একটি বিশৃঙ্খল কলঙ্কময় দিন হিসেবে দিনটি ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দেশপ্রেমিক সৈনিক হত্যা দিবস হিসেবে দিনটির গুরুত্ব রয়েছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক নানা ঘটনাপরম্পরায় শেখ হাসিনা দেশের শাসনকার্য পরিচালনা করছেন। তিনি দেশকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। বাঙালি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ পেয়েছে। এমনি পরিস্থিতিতে ঘাতক চক্র আবার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু যতদিন শেখ হাসিনার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ। ঘাতকদের নীলনকশা আর কোনো দিন বাস্তবায়িত হতে দেবে না এ দেশের মানুষ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাঙালি ঐক্যবদ্ধ। কোনো অপশক্তিই স্বাধীনতা বিপন্ন করতে পারবে না। ৭ নভেম্বর একটি অভিশপ্ত দিবসের নাম। এ অভিশাপ থেকে জাতি মুক্ত হয়েছে। বাঙালি এগিয়ে যাবে আপন মহিমায় আপন গতিতে। 

লেখক : সামছুল আলম দুদু রাজনীতিক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য 

আরও পড়ুন: রাজাপুরে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ইউনিয়নের কমিটি গঠন


Notice: Undefined variable: sAddThis in /home/durjoyba/public_html/details.php on line 808