মোহনগঞ্জে জমি বিরোধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নাটক
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে জটিলতাকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের নাটক সাজিয়ে সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়। আর এ বিষয়টি জানার পর স্থানীয় সংখ্যালঘু নেতৃবৃন্দসহ এলাকাবাসী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এরই মধ্যে গত শুক্রবার বিকেলে এ ঘটনার তদন্তে "বাংলাদেশ মাইনরিটি ওয়াচ" নামে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সভাপতি ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ্যাডভোকেট রবীন্দ্র ঘোষ উপজেলার মাঘান-সিয়াধার ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামে এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে সন্ধ্যায় স্থানীয় সাংবাদিকদেরকে তিনি জানান, মোহনগঞ্জের দাসপাড়া গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের উপর হামলা, ভাংচুর ও নারী নির্যাতনের খবর পেয়ে আমি ঢাকা থেকে এসেছি। এই ঘটনার তদন্ত শেষে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সরকারের কাছে সুপারিশ করব। তবে এখানে যদি নারীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়ে থাকে, যদি মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়ে থাকে, তবে মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের কাছেও তিনি সুপারিশ করবেন বলে জানান।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার দুপুরে সরজমিনে ঘটনাস্থল উপজেলার মাঘান-সিয়াধার ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামে গিয়ে বিবাদমান দুই পক্ষের লোকজন, প্রতিবেশীসহ স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পাকিস্তান আমল থেকেই দাসপাড়া গ্রামের প্রয়াত নৃপেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী ও প্রয়াত প্রমোদ চন্দ্র চক্রবর্তী নামে সম্ভ্রান্ত পরিবারের এই দুই ভাই বসবাস করতেন। দাসপড়া ও খুরশিমূল এলাকায় তাঁরা বাড়িসহ অনেক সহায় সম্পত্তি রেখে গেছেন। তাঁদের দুই ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁদের অন্যান্য সন্তানেরা ভারতসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করলেও প্রয়াত কৃপেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তীর ছেলে বিজন চন্দ্র চক্রবর্তী (৬৮) ওই গ্রামেই বসবাস করেন এবং তিনি বাপ-দাদার রেখে যাওয়া জায়গাজমি ভোগদখল করে আসছেন।
তখন থেকেই দাসপাড়া গ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের রয়েছে অঢেল সম্পত্তি। সে সময় থেকেই দাসপাড়া এলাকায় তাদের দানকৃত পতিত জায়গায় স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণী পেশার দরিদ্র লোকজন পরিবার নিয়ে বসবাস করে আসছেন। প্রয়াত নৃপেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী ও প্রয়াত প্রমোদ চন্দ্র চক্রবর্তীর দানকৃত খুরশিমূল মৌজায় ৬৭ দাগে ২২ শতাংশ পতিত জায়গায় বসতি স্থাপন করে প্রয়াত দুধনাথ রবিদাস, প্রয়াত সকু রবিদাস ও প্রয়াত লালু রবিদাস নামে তিন ভাই তাদের পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন।
এদিকে দুধনাথ রবিদাস জীবদ্দশায় ওই জায়গা থেকে ৯ শতাংশ জায়গা গত প্রায় ১৫-১৬ বছর আগে একই গ্রামের আক্কাস মিয়া নামে এক নিরীহ কৃষকের কাছে বিক্রী করে তিনি তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে অন্যত্র চলে যান। তখন থেকেই উক্ত ৯ শতাংশ জায়গা আক্কাস মিয়ার পরিবারের লোকজন ভোগদখল করে আসছেন। বাকি ১৩ শতাংশ জায়গায় প্রয়াত লালু রবিদাসের মেয়ের দিকে নাতী বাবুল রবি দাস (৩৯), স্বপন রবিদাস (২৫) ও রাজন রবিদাসরা (২০) ভোগদখল করে আসছেন। এর মধ্যে বাবুল রবিদাস গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এদিকে কৃষক আক্কাস মিয়া গত প্রায় ৩ বছর আগে মৃত্যু বরণ করার পর থেকেই ৬৭ দাগে তাঁর ক্রয়কৃত ৯ শতাংশ জায়গা তাঁর ৩ ছেলে এনামূল হক (২৬), আলিমূল হক (২৪) ও আশিক মিয়া (১৮) তারা ভোগদখল করে আসছেন। কিন্তু গত প্রায় মাস খানেক যাবত তাদের ক্রয়কৃত উক্ত জায়গায় যেতে তাদেরকে বাধা দিয়ে আসছিলেন গ্রাম পুলিশ বাবুল রবিদাস ও তার ভাইয়েরা।
এ অবস্থায় মৃত আক্কাস মিয়ার ছেলে কলেজ পড়ুয়া ছাত্র এনামূল হক গত ৬ নভেম্বর বাবুল রবিদাসদের বিরুদ্ধে আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা জারির আদেশ করান। পরদিন ৭ নভেম্বর মোহনগঞ্জ থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আদালতের দেয়া নিষেধাজ্ঞা জারি করে আসে। কিন্তু এর পরদিন ৮ নভেম্বর প্রতিপক্ষের বাবুল রবিদাস তার লোকজন নিয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উক্ত জায়গা দখলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে তাড়াহুড়ো করে একটি ছাপড়া ঘর নির্মাণ করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ওইদিনই ঘটনাস্থলে গিয়ে গ্রাম পুলিশ বাবুল রবিদাসদেরকে উক্ত জায়গা থেকে ছাপড়া ঘরটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য ১দিনে সময় দিয়ে আসলেও তারা পুলিশের জারিকৃত আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঘর নির্মাণ করার ফলে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটার আশংকায় গত ১১ নভেম্বর পুলিশ বাদি হয়ে গ্রাম পুলিশ বাবুল রবিদাস গংদের বিরুদ্ধে থানায় একটি নন-এফাইয়ার মামলা দায়ের করে। যার মামলা নং ৬৯/২৪ ধারা ১০৭/১১৭(সি) ফৌজদারি কার্যবিধি।
পরবর্তীতে গত ১৫ নভেম্বর গ্রাম পুলিশ বাবুল রবিদাস গংরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী উক্ত জায়গা থেকে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তৈরা করা ঘরটি নিজেরাই ভেঙে নিয়ে যায় এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে হামলা ও ভাঙচুরের নাটক সাজিয়ে তা ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচার করানো হয়। আর নাটকীয় এ ঘটনার জন্য এলাকাবাসী উক্ত জায়গার সাবেক মালিক প্রয়াত নৃপেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তীর ছেলে বিজন চন্দ্র চক্রবর্তীকেই দায়ী করে আসছেন। বিজন চন্দ্র চক্রবর্তী একজন দুষ্ঠ প্রকৃতির লোক। তার প্ররোচনাতেই গ্রামের সহজ-সরল গ্রাম পুলিশ বাবুল রবিদাস তার ভাইয়েরা এ ধরনের নাটক সাজিয়ে এলাকা তথা দেশের ভাব-ভঙ্গি বিনষ্ট করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছেন বলেও এলাকাবাসী জানান।
গ্রাম পুলিশ বাবুল রবিদাস বলেন, আমরা কোনো নাটক সাজিয়ে বা মিথ্যা কোনো কিছুই বলিনি। আমাদের সাথে যা ঘটেছে তাই বলছি।তবে আমাদের বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনা ভারতীয় চ্যানেলে কিভাবে গেল তা আমি কিছুই জানিনা।
প্রতিপক্ষের মৃত আক্কাস মিয়ার ছেলে এনামূল হক বলেন, গত ২০০৯ সালে উক্ত ৯ শতাংশ জায়গা প্রয়াত দুধনাথ রবিদাসের কাছ থেকে আমার বাবা সাফ-কাওলা দলিলমূলে ক্রয় করে তা ভোগদখল করে আসছিলেন। গত প্রায় ৩ বছর আগে আমার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই উক্ত জায়গা আমরা ৩ ভাই ভোগদখল করে আসছি। কিন্তু গত প্রায় ১মাস যাবত বিজন চক্রবর্তীর পরামর্শে গ্রাম পুলিশ বাবুল রবিদাস গংরা আমাদেরকে ওই জায়গায় যেতে বাধা দিয়ে আসছে। আদালত থেকে উক্ত জায়গায় তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারির পরও তারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জোর-পূর্বক আমাদের জায়গায় একটি ছাপড়া ঘর তৈরী করে তা আবার নিজেরাই নাটকীয়ভাবে ভেঙে আমাদের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ এনে ফাঁসোনোর চেষ্টা করে। আমি একজন কলেজ পড়ুয়া ছাত্র। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার চাই।
বিজন চক্রবর্তীর ছোট ভাই অজয় চক্রবর্তী ওরফে বাপ্পী তিনি নেত্রকোনায় বসবাস করেন উল্লেখ করে মোবাইল ফোনে বলেন, আমার বড় ভাই একজন দুষ্ট প্রকৃতির লোক। তিনি গ্রাম পুলিশ বাবুল রবিদাসদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে গ্রামের সহজ-সরল লোকদেরকে বিপদে ফেলানোর জন্য যা-যা করার দরকার তাই করে যাচ্ছেন।
খুরশিমূল গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য আজিজুর রহমান লিটন বলেন, আমাদের এলাকায় বিজন চক্রবর্তী নামের এক লোক মিডিয়ায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের নাটক সাজিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তিনি অত্যন্ত বাজে প্রকৃতির লোক। তার প্ররোচণাতেই জমি সংক্রান্ত বিরোধের ঘটনাকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা ও নির্যাতন বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদেরকে আইনের আওতায় আনার দাবী জানাচ্ছি।
একই ধরেনের মন্তব্য করেন, দাসপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ুন কবির (৫২), কৃষক আল্লদ মিয়া (৬৮), কৃষক রজব আলী (৬০), শাহালম (৪৮), খুরশিমূল গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য আলয় চন্দ্র সরকার (৪৫), রঞ্জিত দাস (৪০), সুকন দাস (৩৮), প্রয়াত দুধনাথ রবিদাসের মেয়ে মিনা রানি রবিদাস (৫২) সহ আরো অনেকেই।
এ ঘটনার সাথে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই উল্লেখ করে বিজন চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, গত প্রায় ৪০ পছর পর আমি এই মুছি বাড়িতে (বাবুল রবিদাসদের বাড়িতে) গত শুক্রবার মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি সাহেব আসাতে আমিও গিয়েছিলাম। তবে ওই বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি কে বা কারা ভিডিও করে ভারতীয় গণমাধ্যমে পাঠিয়েছে আমি তা কিছুই জানিনা।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য ফ্রন্টের নেতা মিহির গোস্বামী বলেন, সম্প্রতি আমরা এই উপজেলায় শারদীয় দুর্গোৎসব ও শ্যামা পূজা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করেছি। কোথাও কোন অপ্রতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংবাদে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পাই আদালতের নিষেধ অমান্য করে বিরোধপূর্ণ জমিতে ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে হামলা ও ভাঙচুরের নাটক সাজানো ছাড়া এখানে আর কিছুই ঘটেনি। এখানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের তথ্য সঠিক নয়। গণমাধ্যমে এমন আজগুবি ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশে আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আদালতের নিষেধ অমান্য করে বিরোধপূর্ণ জমিতে প্রতিপক্ষের বাবুল রবিদাস গংদের ঘর নির্মাণ করায় থানায় তাদের বিরুদ্ধে একটি নন-এফায়ার মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি এখানে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের তদন্ত চলমান রয়েছে। তবে সম্প্রতি মিডিয়ায় এই ঘটনাটিকে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সংবাদ প্রচার অতিরঞ্জিত ছাড়া আর কিছুই নয়।
আরও পড়ুন: বারহাট্টায় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহিদের স্মরণে স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত
হাফিজুর রহমান চয়ন