স্কুলটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের আজন্ম লালিত স্বপ্ন এবং স্মৃতি
গ্রামের নাম কুতুবপুর। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইল বাড়ি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম। এ গ্রামের আশপাশে কোনো বিদ্যালয় ছিল না। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ সিদ্ধান্ত নেন, গ্রামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন। এ উদ্দেশ্যে ১৯৯৬ সালে তিনি কাজ শুরু করেন। নাট্যাভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর এই বিদ্যাপীঠের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। স্কুল ভবনের নকশা এঁকে দেন মেহের আফরোজ শাওন। ২০০২ সালে স্কুলটির নির্মাণকাজ শেষ হয়।
স্কুলটির অন্যতম বৈশিষ্ট এই যে, একাত্তরে শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে স্কুলটির নামকরণ করা হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের বাবা ফয়জুর রহমান একাত্তরে শহীদ হয়েছেন। বাবার স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি বাবার নামে এই স্কুলের নামকরণ করতে পারতেন। মা আয়েশা ফয়েজেরও এমনটাই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে দেশের সব শহীদের কথা ভেবে তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে স্কুলের নাম দেন 'শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ।
স্কুল নির্মাণ শেষে তিনি ভেবে দেখেন এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান তার পক্ষে একা চালানো সম্ভব নয়। তাই তিনি সরকার কিংবা বেসরকারি কোনো সংস্থাকে স্কুলের দায়িত্ব ভার নেয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সরকার বা কোনো সংস্থা দায়িত্ব নিতে আগ্রহ দেখায়নি। অবশেষে ২০০৮ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে মাত্র ৪৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেন। বর্তমানে এ বিদ্যাপীঠে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৩৭ জন। শুরু থেকেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট বেশ ভালো। মেধা তালিকায় স্থান অর্জনসহ শিক্ষার্থীদের পাসের হার শতভাগ। শুরুতে হুমায়ূন আহমেদ স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি নিজেই স্কুলের সব সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন। তার মৃত্যুর পর এ দায়িত্ব পালন করছেন সহধর্মিণী মেহের আফরোজ শাওন।
হুমায়ূন আহমেদের জীবদ্দশায় দেশের প্রথিতযশা অনেক কবি-সাহিত্যিক ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অজপাড়াগাঁয়ের এ বিদ্যাপীঠে এসে মুগ্ধ হয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেগুলো পুরণ হয়নি। তার মৃত্যুর পর কেউই আর এ বিদ্যাপীঠের খোঁজখবর রাখেন না। অথচ হুমায়ূন আহমেদ স্বপ্ন দেখতেন এবং গর্ব করে বলতেন, তোমরা দেখে নিও, একদিন এ স্কুলটি দেশসেরা বিদ্যাপীঠে পরিণত হবে। এর সুনাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।
শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, এ স্কুলকে ঘিরে হুমায়ূন স্যারের অনেক স্বপ্ন ছিল। স্যার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তবে স্যার বেঁচে থাকতে স্কুলটি সব সময় জমজমাট থাকত। স্যারের মৃত্যুর পর এখন আর তেমন কেউ আমাদের খোঁজ নেন না। স্কুলটি আজও এমপিওভুক্ত হয়নি।
স্কুলটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হুমায়ন আহমেদের আজন্ম লালিত স্বপ্ন এবং স্মৃতি। কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে কুতুবপুর গ্রাম হতে পারে চমৎকার একটি ভ্রমণের জায়গা। ভক্ত-পাঠক তাদের প্রিয় সাহিত্যিকের নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান দেখতে এই গ্রামে আসবেন এমনটি আশা করাই যায়।