বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী
ষাট দশকে নেত্রকোণা মহকুমা শহর থেকে ‘‘উত্তর আকাশ’’ নামে একটি উন্নত মানের পত্রিকা প্রকাশিত হতো। পত্রিকাটি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, স্থানীয় সংবাদসহ বেশ কয়েকটি বিভাগ নিয়ে বের হতো। নেত্রকোণার সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যসহ লোক সাহিত্যের বিভিন্ন দিক তুলেধরা এবং কিছু কবি, সাহিত্যিক তৈরী করার উদ্দেশ্য নিয়েই পত্রিকাটির যাত্রা শুরু হয়েছিল।
প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক মরহুম খালেকদাদ চৌধুরীর সম্পাদনায় এবং আলী ওসমান সিদ্দিকীর প্রকাশনা, সিদ্দিক প্রেস, কোর্ট রোড নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত হতো এই উত্তর আকাশ পত্রিকা। বর্তমানে নেত্রকোণা শহর থেকে বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা বের হলেও উত্তর আকাশের মতো করে কোনটাই হচ্ছে না।
জাতীয় পর্যায়ে সংবাদ, স্থানীয় সংবাদ নিয়ে পত্রিকাগুলো বের হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু নেত্রকোণা আঞ্চলিক মুখপত্র হিসাবে নেত্রকোণাকে জাতীয় পর্যায়ে কতটুকু তুলে ধরতে পারছে? নেত্রকোণার দৈনিকগুলো কি পাড়বে নেত্রকোণার মুখপত্র হিসাবে উত্তর আকাশের শূণ্যস্থান পূরণ করতে? এনিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
নেত্রকোণার আঞ্চলিক মুখপত্র হিসাবে এই উত্তর আকাশ এ অঞ্চলের মানুষের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক অনুষ্ঠানাদিসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিনিক জীবনের পথচলা আমাদে পূর্বসূরীদের সুনিপুণ হাতের ছোঁয়ায় লোক সাহিত্যের ভান্ডার খ্যাত নেত্রকোণাকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার মাধ্যমে বিরল সম্মান এনে দিয়েছেন। তাই ভূলে যাওয়া উত্তর আকাশ সম্বন্ধে আমরা জানতে পারি প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরীর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ শতাব্দীর দুই দিগন্ত পাঠ করে।
খালেকদাদ চৌধুরী ভাষায় ‘‘উনিশ বাষট্টি সাল, একজন সাহিত্যিক মহকুমা প্রশাসক, নাম তার নূরুল ইসলাম খান। তিনি এসেই জানতে পারলেন আমি এখানকার লোক এবং এখানেই আছি। একদিন তিনি আমাদের কয়েকজনকে ডেকে প্রস্তাব দেন যে এখান থেকে একটি পত্রিকা বের করার। এ প্রস্তাবে সবার মনেই উৎসাহ দেখা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায় এর খরচপত্র কি করে ব্যবস্থা করা যাবে। এর ব্যবস্থা তিনিই করবেন বলে আশ্বাস দেন। কিন্তু তখন তিনি সে সম্বন্ধে আর কিছু বলেননি। সপ্তাহ খানেক পরে আবার আমাদের ডেকে টাকার ব্যবস্থা তিনি করেছেন বলে আশ্বাস দেন।
এরপর তিনি সেই বৈঠকেই আমাকে সম্পাদক করে একটি সম্পাদক মন্ডলী ও পরিচালক মন্ডলী গঠন করেন। তাকে করা হয় প্রধান পরিচালক এবং সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, স্থানীয় সংবাদ এই কয়েকটি বিভাগ থাকবে পত্রিকায়। পত্রিকাটি হবে পাক্ষিক। নামকরণ করলেন তিনি। নাম রাখলেন উত্তর আকাশ। প্রকাশক করা হলো স্থানীয় সিদ্দিক প্রেসকে। এর অর্থ এবং যাবতীয় খরচের অর্থ আসবে মৌলিক গণতন্ত্রের ফান্ড থেকে। সেটা ছিল মৌলিক গণতন্ত্রের যুগ। ফান্ডও ছিল যথেষ্ট। তার থেকেই উত্তর আকাশ-এর যাবতীয় ব্যয় বহন করা হবে। তবে তাতে মৌলিক গণতন্ত্র সম্বন্ধে সংবাদ থাকবে। তাছাড়া মৌলিক গণতন্ত্রী সকল ইউনিয়নের প্রত্যেক সদস্যকেই এর গ্রাহক শ্রেণীভুক্ত করা হলো। এছাড়া বিজ্ঞাপনও ছিল যথেষ্ট। তাতেই উত্তর আকাশের একটা নিজস্ব তহবিল গড়ে উঠে।
তাই পত্রিকাটি পাক্ষিক হলেও অনিয়মিতভাবেই প্রকাশ হতে থাকে। আমি নিজে মৌলিক গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলামনা এমনকি আমি ছিলাম আওয়ামীলীগের একজন সদস্য। তবে সাহিত্য ও সাহিত্যের মাধ্যমে নেত্রকোণাকে তার ঐতিহ্য, তার ইতিহাস বাহিরের লোকদের কাছে তুলে ধরা এবং নেত্রকোণায় কিছু কবি সাহিত্যিক তৈরি করার আশা নিয়েই আমি আমার নীতির বিরুদ্ধেই মৌলিক গণতন্ত্রের মুখপত্র উত্তর আকাশের সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করি।
নিয়মিত সম্পাদকীয় লেখা ছাড়াও উত্তর আকাশে আমার বেশ কিছু গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘‘সাপ মারির অভিশাপ’’ ‘‘গড় শংকরী’’ ‘‘রক্তাক্ত অধ্যায়’’ ‘‘এ মাটি রক্তে রাঙ্গা’’ উপন্যাস গুলি ধারাবাহিকভাবে উত্তর আকাশে প্রকাশিত হয়। ‘‘অভিশপ্ত মসনদ’’ ‘‘শেষ রণাঙ্গণ’’ উপন্যাসের অংশ বিশেষও এতে প্রকাশিত হয় এগুলিই পরবর্তীকালে আমার সে উদ্দেশ্য সাধনের প্রমাণ। এর মাধ্যমে নেত্রকোণার ইতিহাস, কিংবদন্তী, লোক সাহিত্য, গীত, গান এবং বিভিন্ন প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
নতুন নতুন তরুণ কবিরাও এতে লেখা প্রকাশের জন্য আসতো। যাদের ভিতরে কিছুটা প্রতিশ্রুতি লক্ষ্য করা গেছে তাদের উৎসাহিত করা হতো। নূতনদের লেখা কবিতা গল্প ইত্যাদি নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। এখানেই হাতে খড়ি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি নির্মলেন্দু গুণ, সুকোমল বল, নূরুল হক, দীলিপ দত্ত, শান্তিময় বিশ্বাস, যতীন্দ্র সরকার ও আরো অনেকের। এছাড়া বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি রফিক আজাদ সে সময়ে ছিলেন নেত্রকোণা কলেজের ছাত্র। তিনিও নিয়মিত এতে কবিতা লিখতেন। এতদ্ভিন্ন কবি খান মোঃ আঃ হাকিম, অধ্যাপক শামস উদ্দিন আহম্মেদ, দত্ত হাই স্কুলের শিক্ষক খোরশেদ আলী তালুকদার, বিখ্যাত বাউল কবি জালাল উদ্দিন খাঁ, সিরাজী উদ্দিন কাসিমপুরী এবং আরো অনেকে ছিলেন এর নিয়মিত লেখক।
এদের মধ্যে অনেকই বর্তমানে সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। উত্তর আকাশের মাধ্যমেই এরা সাহিত্যিক, কবি হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছেন। উত্তর আকাশের এই হলো শ্রেষ্ঠতম অবদান। এমনি করে উত্তর আকাশকে খুব সতর্কতা ও যত্নের সাথে সাহিত্য পত্রিকায় রূপান্তরিত করা হয়। সাহিত্য সৃষ্টিই হয়ে দাঁড়ায় এর মূখ্য উদ্দেশ্য।
দীর্ঘ সাত বৎসর নিয়মিতভাবে উত্তর আকাশ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এহিয়া খানের মার্শাল’ল জারী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ পত্রিকাটি বন্ধ করে দেন। শেষ ছাপান বাধান সংখ্যাটিও আর প্রকাশিত হতে পারেনি। পরের দিনেই তা প্রকাশের জন্য তৈরি ছিল।
উত্তর আকাশকে কেন্দ্র করেই নেত্রকোণায় ৬ দিনব্যাপী এক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৮ সনের ২৩ শে ফেব্রুয়ারী থেকে ২৯শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত সম্মেলন চলে। এই সম্মেলনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিকদের উপস্থিতি ছিল স্মরণ রাখার মতো। এই সম্মেলনে অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁ, কবি আব্দুল কাদির, আবুল কালাম সামছুদ্দিন, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন, শিল্পী কামরুল ইসলাম, সাংবাদিক মজিবুর রহমান খাঁসহ স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকগণ উপস্থিত ছিলেন। এই সাহিত্য সম্মেলনটি নেত্রকোণার সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
লেখকঃ হায়দার জাহান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক
আরও পড়ুন: নেত্রকোণার লোকসংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য